তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলবর্তী সাগরে নিজেদের কোস্ট গার্ড ও বেসামরিক জলযানের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে চীন। সামরিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে বহির্বিশ্বের বাণিজ্য ও যেকোনো সাহায্য-সহযোগিতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে একটি ‘অবস্থানগত অবরোধের’ মহড়া দিচ্ছে বেইজিং। চীন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন ও জুলাই মাসজুড়ে চীনের মেরিটাইম সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং কোস্ট গার্ড ওই অঞ্চলে একাধিক টহল ও ‘বিশেষ সামুদ্রিক আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ পরিচালনা করেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন নিয়মিতভাবেই তাইওয়ান প্রণালিতে টহল দিয়ে থাকে। যেটি চীন থেকে তাইওয়ানকে পৃথককারী ১৮০ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি জলপথ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রথমবার পরপর এত দ্রুত গতিতে তাইওয়ানের পূর্বদিকেও এ ধরনের সমন্বিত টহল বাড়াল বেইজিং। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চ’-এর অনাবাসিক ফেলো কে ট্রিস্টান টাং জানান, এই পরিবর্তনের কৌশলগত ও প্রতীকী উভয় ধরনের গুরুত্বই রয়েছে।
টাং বলেন, বেইজিং এর মাধ্যমে সংকেত দিচ্ছে যে, তারা তাদের দাবি করা প্রশাসনিক অঞ্চল তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে চায়। এর ফলে শুধু তাইওয়ান প্রণালিতে তাদের উপস্থিতি জাহির করাই নয় বরং তারা তাইওয়ানকে কার্যকরভাবে ঘিরে ফেলতে চাচ্ছে। তাইপেইয়ের মতে, চীনের এই ‘আইন প্রয়োগকারী অভিযানের’ মধ্যে রয়েছে এলাকাটিতে টহল দেওয়া ও বাণিজ্যিক জাহাজের কাছে সেগুলোর উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য চাওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মেরিটাইম ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট ‘সি লাইট’-এর পরিচালক রে পাওয়েল এই পদক্ষেপকে চীনের ‘বোয়া কনস্ট্রিক্টর স্ট্র্যাটেজি’ অজগরের মতো চেপে ধরার কৌশল বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, বেইজিং ধাপে ধাপে তাইওয়ানের ওপর চাপ বৃদ্ধি করছে।
আলজাজিরাকে পাওয়েল বলেন, আজ তারা বাণিজ্যিক জাহাজ থামিয়ে রেডিওতে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, কাল হয়তো তল্লাশি চালানো বা পথ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কাজ শুরু করবে। তাইওয়ানের মতো দ্বীপ রাষ্ট্রের জন্য জ্বালানি (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ করে কোণঠাসা করা বেইজিংয়ের জন্য খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। তার মতে, চীনের এসব পদক্ষেপ তাইওয়ানের অর্থনীতি ও মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে দ্বীপটির ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে বোঝানো যায় যে চীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া তাইওয়ানের জন্য অনিবার্য।
চলতি বছরের জুনে তাইওয়ান সংলগ্ন সাগরে অন্তত ৫৫টি চীনা কোস্ট গার্ড ও গবেষণা জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে তাইপেই, যা মে মাসের (৩০টি) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চীনের এই আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স। এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো জানায়, চীনের এই একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও চীনের এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন।