মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এতদিন সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর নীতি অনুসরণ করলেও এবার সৌদি আরব সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি, ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে তিন দিক থেকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে রিয়াদকে।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে উত্তেজনা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছিল সৌদি আরব। এমনকি ইরানের ড্রোন হামলায় দেশটির তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। কিন্তু গত সপ্তাহে সেই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে একাধিক হামলা চালায় সৌদি যুদ্ধবিমান। সৌদি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া।
যুদ্ধ এড়িয়ে চলার নীতিতে ধাক্কা
অর্থনৈতিক সংস্কার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করাই গত এক দশকে সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য ছিল। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তিও করে রিয়াদ।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই নীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ উপকূলরেখা ও বিস্তৃত তেল অবকাঠামো রক্ষার পাশাপাশি তিনটি ভিন্ন দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করা সৌদি আরবের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
হুতিদের হামলায় নতুন উদ্বেগ
সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর দুটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। স্যাটেলাইটচিত্র ও বিভিন্ন ভিডিওতে জিজানের একটি স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজ অবরোধের ঘোষণা দেয় হুতিরা। পাশাপাশি লোহিত সাগরে সৌদির দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর পাশাপাশি আরও একটি জাহাজে হামলার দাবিও করে গোষ্ঠীটি।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে সৌদি আরব বর্তমানে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেলের বড় অংশ রপ্তানি করছে। ফলে বাব আল-মানদেবে হুতিদের অবরোধ দেশটির জ্বালানি রপ্তানির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আগামী তিন বছরে লোহিত সাগর হয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির পরিকল্পনা করেছে সৌদি আরব। কিন্তু ইয়ানবু থেকে এশিয়ামুখী ট্যাংকারগুলোকে বাব আল-মানদেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়, যা এখন হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতিদের ক্ষমতাচ্যুত করতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি আরব। তবে সাত বছর যুদ্ধ করেও তাদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সময়ে হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অর্থনৈতিক ও আকাশপথে অবরোধ বজায় রেখেছে রিয়াদ।
সম্প্রতি হুতি গোষ্ঠী অভিযোগ করেছে, তেহরান থেকে সানায় অবতরণ করতে যাওয়া একটি বিমানে হামলা চালিয়ে বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয় সৌদি বাহিনী। ওই বিমানে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা শেষে ফেরা একটি হুতি প্রতিনিধিদল ছিল।
কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধবিষয়ক গবেষক নাওয়াফ ওবেইদের মতে, ওই বিমানে আর কী ধরনের সামগ্রী ছিল, তা নিয়েও সৌদি কর্তৃপক্ষের বিশেষ আগ্রহ ছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, পূর্ব ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা জড়ো হচ্ছে। তারা অগ্রসর হলে সৌদি বিমানবাহিনী অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের সহায়তা দিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত স্থল অভিযানের বদলে বিমান হামলাকেই অগ্রাধিকার দেবে সৌদি আরব।
ইরাক থেকেও বাড়ছে চাপ
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ও মঙ্গলবার ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা রাজধানী রিয়াদ ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায়। এসব হামলায় হুতি গোষ্ঠীর প্রযুক্তিগত সহায়তা থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এর জবাবে মঙ্গলবার ভোরে পূর্ব ইরাকে ওই মিলিশিয়াদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস জানিয়েছে, ওই হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নির্দেশনায় সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা লক্ষ্য করে ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যৌথ অভিযানটি ছিল সেই হামলার প্রতিক্রিয়া।
ইরানের সরাসরি হুমকিও বহাল
মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরানের শাহেদ ড্রোন সৌদি তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর দ্রুত ড্রোন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় রিয়াদ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও সৌদি সফরে গিয়ে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে এমন সক্ষমতা রাতারাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ফলে পারস্য উপসাগরের ওপার থেকে ইরানের ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
এপ্রিলের পর ইরান সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে হামলা না চালালেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ স্বাধীনভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং এসব হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কিছু আঞ্চলিক দেশও দায়ী।
সংঘাতের শুরুতে সৌদি আরব সীমিত পরিসরে ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালালেও সেটি ছিল আত্মরক্ষার সক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে, বৃহত্তর যুদ্ধ শুরুর জন্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ইরান আবারও সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালালে রিয়াদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করবে। তখন হয় সরাসরি পাল্টা হামলা চালিয়ে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়াতে হবে, নয়তো সংযম দেখিয়ে আরও আগ্রাসনের ঝুঁকি নিতে হবে।
অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে
চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে সৌদি অর্থনীতিতেও। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির বাজেট ঘাটতি ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর কারণে এই চাপ তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ায় রাজস্ব কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও ভবিষ্যতে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হলে সেই সুবিধা টেকসই নাও হতে পারে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের কয়েকটি মেগা প্রকল্পের পরিসরও কমিয়ে আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ওপেক ত্যাগ, ইরান ইস্যু এবং ইয়েমেনে হুতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ঐক্যও এখনো গড়ে ওঠেনি।
সময়ের আলো/আরবিএন