মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ইসরাইলে এমন এক নির্বাচন আসছে, যা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। জিততে পারলেই তিনি টিকবেন, না হলে তার রাজনৈতিক জীবনই শেষ হয়ে যেতে পারে। এমনকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়বে। আর এই লড়াইয়ে জেতার জন্য তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, নিজেকে এমন একজন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা যাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরোপুরি সমর্থন করছেন। এমন এক নেতা যিনি ইসরাইলের টিকে থাকার মূল সংযোগ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে ভালোভাবে সামলাতে পারবেন।
কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসে সবচেয়ে বড় ইসরাইল সমর্থক, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বন্ধু ও বিশ্বস্ত মিত্র লিন্ডসে গ্রাহাম কদিন আগে আকস্মিকভাবে মারা যান। তারপর নেতানিয়াহু আর দেরি করলেন না। তড়িঘড়ি করে রওনা হলেন ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরে ফিলিস্তিন-ইসরাইল আলোচনায় সাবেক উপদেষ্টা এবং বর্তমানে কার্নেগি এন্ডাউমেন্টের গবেষক অ্যারন ডেভিড মিলার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, লিন্ডসে গ্রাহাম মারা না গেলে নেতানিয়াহুর এই সফর কখনোই হতো না।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তাকে কোনো বিদেশি নেতা নেতানিয়াহুর মতো এতবার কাছে পাননি। তবে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে তাদের ৯০ মিনিটের বৈঠকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ এর ঠিক আগেই ট্রাম্প আঙ্কারায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও সিরিয়ার আহমেদ আল-শারার সঙ্গে আর ওয়াশিংটনে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আল-জায়েদি ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
রামাল্লায় ফিলিস্তিন নেতৃত্বের সাবেক উপদেষ্টা এবং জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজার ফারজাখ বলেন, আরবদের সঙ্গে এত বেশি বৈঠক করা একেবারেই অস্বাভাবিক। তার কথায়, শুধু নেতানিয়াহুই ইরানের যুদ্ধ চান। বাকি সবাই আক্ষরিক অর্থে প্রত্যেকেই এই সংঘাত আর বাড়াতে চায় না। তাই আমার মনে হয়, অন্য সব নেতা উত্তেজনার যে আগুন প্রশমিত করার চেষ্টা করছেন তাতে ঘি ঢালতেই তিনি ওয়াশিংটন সফরে গেছেন।
তাদের বৈঠকে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ছিল না। মিলার বলেন, এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে দুই নেতার মধ্যে গর্ব করার মতো সাফল্যের চেয়ে মিটিয়ে নেওয়ার মতো মতপার্থক্যই এখনও বেশি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বৈঠকটিকে ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বললেও, নেতানিয়াহু নিজেই ইসরাইলি সাংবাদিকদের বলেন, এটা কোনো মুখের কথা নয়। আমাদের বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আমার জীবনের অন্যতম সেরা আলোচনা হয়েছে।
তবে ট্রাম্প নিজেই বেশ কিছু দিন ধরে নেতানিয়াহুর আচরণ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ। মার্কিন সময় মঙ্গলবারই ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট বলেন, নেতানিয়াহু চাইছেন তিনি ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যান, কিন্তু তা চাওয়ার কোনো কারণ নেই। তখন প্রশ্ন ওঠে, গোয়েন্দা তথ্য বলছে ইরান ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ এলাকাটিকে দ্রুত শক্তিশালী করছে। আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেবেন?
জবাবে ট্রাম্প বলেন, এটার জন্য আমার ‘বিবি’র (নেতানিয়াহু) কোনো প্রয়োজন নেই। সে আমাকে এ কথা বলছে কারণ সে চাইছে আমি এখানে জড়িয়ে থাকি। কিন্তু আমি আর তা চাই না। সে এটা পুরো বিশ্বের সামনে ঘোষণা করছে কেন? আমি তো জানতাম। এটা কোনো বড় বিষয় নয়। আমরা তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করেছি। চুক্তি না হলে প্রয়োজন হলে এই পাহাড়টাও ধ্বংস করব।
ফারজাখ বলেন, নেতানিয়াহু আবার পারমাণবিক হুমকির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। কারণ গাজা ও লেবানন ইস্যুতে তার দেখানোর মতো কিছুই নেই। ‘আমার মনে হয়, ট্রাম্প ভাবছেন আগামী কয়েক মাস পরেও নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী থাকবেন কি না? হয়তো তিনিই তাকে সরিয়ে দিতেই চাইছেন। কারণ তার কর্মকাণ্ড একেবারে অবিশ্বাস্য।’
এক দিন আগে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পকে এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করা নিয়ে নেতানিয়াহুর আপত্তি রয়েছে, এখন কী করবেন? ট্রাম্প বলেন, তুরস্ক আমার জন্য দারুণ মিত্র। এরদোগান সিরিয়াতে ভালো কাজ করেছেন, আমার বন্ধু। কাকে কী বিক্রি করব সেটা কেউ আমাকে বলবে না। তুরস্ক অবশ্যই ইসরাইলের সমর্থক নয় এটা তো সবাই জানে। গত মে মাসেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইসরাইল বাধা দিতে পারে কি না এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি যা বলব সেটাই করবে নেতানিয়াহু।
মিলার ২৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে কাজ করেছেন। রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সময়ে। তার কথায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো যুদ্ধকালীন মিত্র নেই যারা ইসরাইলের মতো প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু তারপরও ট্রাম্প এমন সব কথা বলছেন যা আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনোই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলেননি।
তিনি তাকে প্রকাশ্যে ব্যঙ্গ করেছেন, তার অশ্লীল কথায় ভরা ফোনালাপ ফাঁস হতে দিয়েছেন, ইসরাইলকে কিছুই না জানিয়ে হামাসের সঙ্গে কথা বলেছেন, ইসরাইলের আপত্তি সত্ত্বেও হুথিদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। আর এখনই নেতানিয়াহুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের ঠিক ৯০ দিন আগে ট্রাম্পের কাছে তাকে নিয়ে এমন ক্ষমতা রয়েছে, যা আগে কোনো প্রেসিডেন্টের কাছেই ছিল না। এমনকি তার দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের জেলও হতে পারে।
ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর নেতানিয়াহু যখন জর্জটাউনের ফোর সিজনস হোটেলে যান, তখন পুরো পথজুড়ে প্রতিবাদকারীরা ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে “যুদ্ধাপরাধী” বলে চিৎকার করেন। প্রায় দুই বছর আগে থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সেই আদালতের সদস্য না হলেও, এখনও বিশ্বের খুব কম দেশই আছে যেখানে নেতানিয়াহু নিরাপদে যেতে পারেন।
এদিকে দি ইকোনমিস্ট ও ইউগভের নতুন জরিপ বলছে, প্রায় অর্ধেক মার্কিন নাগরিক চান তাকে গ্রেফতার করা হোক। ১৫৫৯ জন নাগরিকের ওপর চালানো জরিপে ৪৯ শতাংশ বলেন গ্রেফতার করা উচিত, ২৭ শতাংশ বলেন না, আর বাকিরা কিছুই বলেননি। গ্রেফতারের পক্ষে থাকা বেশিরভাগই ৫০ বছরের নিচে এবং শ্বেতাঙ্গ নন। আর সিবিএস নিউজের সঙ্গে ইউগভের আরেক জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ মার্কিন চান ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনই বন্ধ হোক। যাদের বেশিরভাগই ৩০ বছরের নিচে। ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে ৯২ শতাংশ, স্বতন্ত্রদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ আর রিপাবলিকানদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে।
ফারজাখ বলেন, ইরান নিয়ে কিছু কাজ করছে না। ইরান দিন দিন শক্তিশালী হয়েই চলেছে। ট্রাম্প নিজেই এই জটে জড়িয়ে পড়েছেন, আর এখন তিনি বের হয়ে আসার পথ খুঁজছেন। কিন্তু নেতানিয়াহু যদি নির্বাচনে ‘নিরাপত্তার রক্ষক’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার রাজনীতি করেন, তবে ট্রাম্পের এই পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে নেতানিয়াহু আবার ওয়াশিংটনে আসবেন। তার আগে এই সম্পর্কের টানাপোড়েন কোথায় গড়ায় সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সময়ের আলো/আআ