এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইয়াংজি একসময় শিল্পবর্জ্য, নর্দমার পানি, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং বিশাল বাঁধ নির্মাণের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীকে চীনের ‘মা নদী’ বলে ডাকা হয়। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনায় এর জীববৈচিত্র্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নদীটি থেকে এরই মধ্যে সাদা পেটের বাইজি ডলফিন কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একই পরিণতি হয়েছে বিশালাকৃতির চাইনিজ প্যাডলফিশের। তবে সব ক্ষতি স্থায়ী হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়াংজি নদীকে ঘিরে নেওয়া কঠোর সংরক্ষণ নীতির ফলে নদীটি আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
২০২১ সাল থেকে চীনে নদীটিকে রক্ষায় একাধিক কঠোর পদক্ষেপ কার্যকর হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের গবেষকদের প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, গত সাত দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা ইয়াংজির মাছের মোট ‘বায়োমাস’ ২০২১ সালের পর থেকে ২০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
এপ্রিল মাসে বিজ্ঞানীরা প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি বিরল প্রজাতির স্টার্জন মাছকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ডিম ছাড়তে দেখেন। জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, নদীর উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মাছ এখন প্রজননক্ষম বয়সে পৌঁছাতে পারছে। ফলে আগামী প্রজন্মের মাছের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইয়াংজি অববাহিকায় এখন ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি ফিনলেস পরপয়েস বাস করছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছিল প্রায় ১ হাজারে। স্থানীয়রা গোলগাল ও চ্যাপ্টা নাকের এই স্তন্যপায়ী প্রাণীকে ‘নদীর শূকর’ নামে ডাকে। ইয়াংজি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল ১০ বছরের জন্য বাণিজ্যিক মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা।
১৯৫০-এর দশকে প্রতি বছর ইয়াংজি নদী থেকে ৪ লাখ টনের বেশি মাছ ধরা হতো। কিন্তু ২০২১ সালে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে সেই পরিমাণ কমে এক লাখ টনেরও নিচে নেমে আসে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীতে নিয়মিত টহল, ড্রোন, নজরদারি ক্যামেরা এবং কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেও এই কর্মসূচির অন্যতম সমর্থক। স্থানীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সঙ্গে পরিবেশগত সাফল্যও যুক্ত করা হয়েছে।
অবৈধ মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ কমেছে। চীন নদী-তীরবর্তী হাজার হাজার রাসায়নিক কারখানা বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। নদীর উজানে অনেক গাছ লাগানো হয়েছে, যাতে মাটি ক্ষয় হয়ে নদীতে না নামে।
এ ছাড়া নদী অববাহিকার বহু শহরকে ‘স্পঞ্জ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। কৃত্রিম জলাভূমি, পানি শোষণকারী রাস্তা ও সবুজায়নের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হচ্ছে। এতে বন্যার ঝুঁকি কমছে, একই সঙ্গে দূষিত পানি পরিশোধিত হয়ে নদীতে যাচ্ছে। চীনা সংরক্ষণবিদ ওয়াং লিমিনের মতে, পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ দ্রুত একত্র করার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে চীনের।
তার মতে, ফিনলেস পরপয়েসের সংখ্যা বৃদ্ধি পুরো বাস্তুতন্ত্র সুস্থ হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। কারণ এটি খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষের প্রাণী এবং পরিবেশের সামগ্রিক অবস্থার সংবেদনশীল সূচক। তবে এই সাফল্যের মানবিক মূল্যও কম নয়।
মাছ ধরা নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার জেলে জীবিকা হারিয়েছেন। তাদের নৌকা জব্দ বা ধ্বংস করা হয়েছে।
সরকার দাবি করেছে, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, নতুন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং অনেকেই আগের চেয়ে ভালো চাকরি পেয়েছেন। ইয়াংজির তীরবর্তী জুনশান হ্রদের পাশে জিনশিয়ান এলাকার অনেক জেলের দাবি, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে মাত্র একজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। আর যারা পেয়েছেন, তাদের অর্থ আগের আয়ের তুলনায় অনেক কম। অনেকেই বাধ্য হয়ে বড় শহরে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন।
এক সাবেক নারী জেলে, যিনি এখন একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান, বলেন, ‘সরকার সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ মানুষের কথা কেউ শোনেনি। তাদের সঙ্গে তর্কও করা যায় না।’ অন্য এক সাবেক জেলে ঝাং এখন সরকারের পরামর্শে পুকুরে জলজ ইল চাষ করছেন। কিন্তু তার মতে, মাছ ধরার চেয়ে এ ব্যবসায় বিনিয়োগ বেশি এবং লোকসানের ঝুঁকিও অনেক। তিনি বলেন, ‘এ বছর সবাই লোকসান গুনছে।’
তবে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চীনের সাফল্য থাকলেও এর কিছু বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ১৯৫০-এর দশক থেকেই চীনা সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় বড় বাঁধ নির্মাণে জোর দিয়েছে। ইয়াংজি নদীতে ইতিমধ্যে ‘থ্রি গর্জেস ড্যাম’সহ অন্তত ১২টি বিশাল বাঁধ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পুরো অববাহিকায় রয়েছে হাজার হাজার ছোট বাঁধ।
বিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত মাছ ধরার মতোই এই বাঁধগুলোও নদীর জীববৈচিত্র্যের বড় ক্ষতি করেছে। কারণ বাঁধের কারণে মাছ ডিম ছাড়ার জন্য নদীর উজান-ভাটিতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। তবু চীন নতুন নতুন বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্টিভেন কুকের ভাষায়, ‘জলবিদ্যুৎ খাত যেন সবসময় ছাড় পেয়ে গেছে। অন্য খাতগুলোতে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তেমন কিছু বদলায়নি।’ তার মতে, পুরোনো বাঁধ অপসারণ করা বা মাছ চলাচলের জন্য বিশেষ পথ (ফিশ প্যাসেজ) তৈরি না করলে ইয়াংজি নদীর পুনরুদ্ধার একটি সীমায় গিয়ে থেমে যাবে।
সময়ের আলো/আআ