যুদ্ধে যেভাবে টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ চলছে। তবু টিকে রয়েছে ইরানের সংকটগ্রস্ত অর্থনীতি। কোটি কোটি সাধারণ মানুষ প্রতিদিন জীবিকা ও

2026-07-31T03:07:58+00:00
2026-07-31T03:07:58+00:00
 
  শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধে যেভাবে টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ চলছে। তবু টিকে রয়েছে ইরানের সংকটগ্রস্ত অর্থনীতি। কোটি কোটি সাধারণ মানুষ প্রতিদিন জীবিকা ও অস্তিত্বের লড়াই করছেন। তা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়ার মতো পরিস্থিতি থেকে এখনও অনেক দূরে। ইরানের জনসংখ্যা ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ।

বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে একটি ইরান। এসব কিছুর সমন্বয়ে তারা অনেক বছর ধরে বৈচিত্র্যময় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। তারা মূলত স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দ্বন্দ্বের মুখে দাঁড়িয়ে এই অবস্থান তৈরি করেছে তেহরান।

কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেবা খাতে বেশ উন্নতি করেছে ইরান। এতে দেশটির অর্থনীতিতে তেলের ওপর এককনির্ভরতাও কমেছে। এ ছাড়া গোপনে তেল রফতানি, সীমান্ত বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নেটওয়ার্ক সচল রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বড় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। এসব কারণেই মার্কিন চাপের মুখেও দেশটির অর্থনীতি টিকে আছে।

তবে এই সংকটের প্রধান ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। এক দশকের বেশি সময় ধরে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। গত বছরের জুন থেকে তারা দুটি যুদ্ধ দেখেছে। দেশে রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভ হয়েছে। বারবার বন্ধ করা হয়েছে ইন্টারনেট। এসব কারণে ইরানিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও উপার্জন মারাত্মক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

ওয়েলফেয়ার ইকোনোমিস্ট হাদি কাহালজাদেহ অর্থনৈতিক পতনের একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। তার মতে, পতন মানে মূলত দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়া। অথবা সরকারের পক্ষ থেকে কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারা ও সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া। সেই হিসেবে ইরানের অর্থনীতি এখনও ধসে পড়েনি।

তিনি ম্যাসাচুসেটসের ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং কোয়িন্সি ইনস্টিটিউটের ফেলো। কাহালজাদেহ আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ, অবরুদ্ধ অবস্থা ও নিষেধাজ্ঞার সম্মিলিত আঘাত অসহনীয় বিপর্যয়। তবু এটি ইরানকে খুব দ্রুত অর্থনৈতিক পতনের দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে হয় না। এই বহুমাত্রিক সংকটে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তিন গুণের বেশি বেড়েছে।

মাংস, ডিম ও রান্নার তেলের দাম অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় মানুষের আয় মোটেও বাড়েনি। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দরপতন থামছেই না। ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম হয়েছে আকাশছোঁয়া। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারির শেষে মার্কিন-ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ফলে নতুন পণ্য আমদানির পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

কাহালজাদেহ জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে ইরানকে এই ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে। এতে বাজারে পণ্য ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরকার নগদ সহায়তাও কুপন দিচ্ছে। তবে এটি বেঁচে থাকার একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল পথ। এর মাধ্যমে কেবল পতন ঠেকানো যায়।

বর্তমানে ইরানে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১০০ ডলারেরও কম। সরকার কুপন ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে মাসে আরও কয়েক ডলার সাহায্য দেয়। ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কুপন প্রকল্পের দোকানগুলোতে সরকার অর্থ বরাদ্দ করেছে। তবে সাইবার হামলার কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। তাই দোকানদাররা এখনও সেই টাকা পাননি।

তিনি আরও জানান, চলতি মাসে মার্কিন বোমাবর্ষণে অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হয়েছে। ১২টি সেতু, দুটি টানেল এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে কারখানায় আগে সপ্তাহে ৩ দিন বিদ্যুৎ বন্ধের পরিকল্পনা ছিল। তা কমিয়ে ২ দিনে আনা হয়েছে। এটিকে তিনি সরকারের সাফল্য বলে দাবি করেন।

সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ বছর আগে ৩০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। চলতি বছরে তা বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। জার্মানির মারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগানের পেছনের কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন।

তিনি জানান, অদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বড় হুমকির মুখে পড়েছে। তেল রফতানির আয় দিয়ে সরকার এতদিন অনিয়ম লুকিয়ে রেখেছিল। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে; যা দেশের বেসরকারি খাত ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

ইরানের জেনারেল ইন্সপেকশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জবিহুল্লাহ খোদায়িয়ান গত রোববার স্টেট টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে জানান, তেল বিক্রির আয়ের টাকা ফেরত আনার দায়িত্বে কিছু ট্রাস্টি ছিল। তারা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাদের কাছে বর্তমানে অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। 

এর মধ্যে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে। কয়েকজন গ্রেফতার হলেও একজন ২০০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এ ছাড়া ২০ হাজারেরও বেশি রফতানি আয়ের অর্থ দেশে আসেনি। এর পরিমাণ প্রায় ১০৭ বিলিয়ন ডলার। তাদের মধ্যে ২২৫ জন বড় ব্যবসায়ী রয়েছেন। এদের প্রত্যেকের কাছে অন্তত ৫৭ মিলিয়ন ডলার করে পাওনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ কাহালজাদেহ আলজাজিরাকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার কারণে সমাজকাঠামো বদলে গেছে। ২০১১ সালেও দেশের বেশিরভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত ছিল। এখন মধ্যবিত্তরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। আর দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্র বা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।

তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের চিত্র বেশ করুণ। মানুষের খাবারের তালিকা থেকে মাংস ও দুধ বাদ পড়েছে। অনেকে বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেন না। চিকিৎসাসেবা নিতে পারছেন না। মাস শেষ হওয়া তো দূরের কথা, কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে মাসিক বেতন। কাহালজাদেহ সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কমলেও ক্ষতি পূরণ হবে না। পরিবারগুলোর সঞ্চয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে বহু বছর লাগবে।

মার্কিন যুদ্ধক্ষেত্র এখন লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভেতরের দিকে কূটনৈতিক আলোচনাও চলছে। তবু বিশ্লেষকদের মতে, কেবল অভ্যন্তরীণ সংস্কার দিয়ে ইরানের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদ ফারজানেগান বলেন, চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সাময়িক বাণিজ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সমাধান সম্ভব নয়। কূটনীতির মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানো এখন মূল পথ। একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশ ছাড়া ইরানের অর্থনৈতিক বিকাশ সম্ভব হবে না।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   যুদ্ধ  ইরান  অর্থনীতি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: