প্রফেসর ডা. এম এ মুহিত সামলাচ্ছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। তার স্বাস্থ্য ও জনসেবা কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত। সম্প্রতি স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, তৃণমূলে চিকিৎসা চিত্র, এই খাতে অনিয়মসহ নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক সাব্বির আহমেদ।
প্রশ্ন : বর্তমান সরকার দায়িত্বের শুরুতেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট না বাড়ালে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কি সম্ভব হবে?
ডা. এম এ মুহিত : এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকারি হাসপাতাল পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। যখন একটি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়, তখন তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনবল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সুবিধারও নির্ধারিত মানদণ্ড থাকে।
আপনি যথার্থই বলেছেন, শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না। আমরাও কেবল শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি না। শয্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো মানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণও। এটি সময়সাপেক্ষ। গত সপ্তাহেই আমরা এ বিষয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হাসপাতালের নকশা (ডিজাইন) নিয়ে বৈঠক করেছি। চিকিৎসকদের মতামত নেওয়া হচ্ছে, প্রকৌশলীরাও তাদের মতামত দিচ্ছেন, যাতে হাসপাতালগুলো কার্যকর ও আধুনিকভাবে নির্মাণ করা যায়।
একই সঙ্গে জনবল নিয়োগের কাজও চলছে। আমরা ধাপে ধাপে সেই কাজগুলো এগিয়ে নিচ্ছি। আমাদের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকে। অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে, আবার অনেকগুলোর আর প্রয়োজনও নেই। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপচয়রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
আমরা দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র পাঁচ মাস হলো। কিন্তু আপনারা যে প্রশ্নগুলো করছেন, সেগুলো বর্তমান সময়কে কেন্দ্র করে হলেও মূলত অতীতের সমস্যাগুলো নিয়ে। আমরা ইতিহাসের অব্যবস্থাপনার দায় বহন করছি। গত ১৫-১৭ বছরে যে জঞ্জাল তৈরি হয়েছে, সেই জঞ্জাল নিয়েই আমাদের কাজ শুরু করতে হয়েছে।
আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনগণের কাছে আমার জবাবদিহি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এসে প্রথমেই আমাদের বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর জনগণের কাছে জবাবদিহি আছে। কিন্তু অন্য কর্মকর্তাদের মূল দায়বদ্ধতা চাকরির প্রতি। তাই আমরা প্রতিনিয়ত মনে রাখছি, জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। জনগণের চিকিৎসার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, শুধু সেগুলোই কেনা হবে। সেই যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করেই সেগুলো স্থাপন করা হবে।
বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, রোগীদের হয়রানি এবং সেবা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল, পঙ্গু হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দীসহ বড় হাসপাতালগুলোতে এ সমস্যা প্রকট। এসব বন্ধে সরকার কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে?
আমার কাছে মনে হয়েছে, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সরকারি হাসপাতালে চারটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমত হাসপাতালের গেটে পৌঁছানোর পর মানুষ দুটি জিনিস দেখতে পায়, যা তারা দেখতে চায় না। একটি হলো ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, আরেকটি হলো দালালের দৌরাত্ম্য। এরপর যদি তারা ভেতরে ঢুকতে পারে, চিকিৎসক খুঁজতে গিয়ে দেখে অনেক চিকিৎসক কর্মস্থলে নেই।
তৃতীয়ত কোনোভাবে চিকিৎসকের দেখা পেলেও প্রেসক্রিপশনে কয়েকটি ওষুধ লেখা থাকে। একজন দরিদ্র মানুষ আশা করে অন্তত কিছু ওষুধ সরকারি হাসপাতাল থেকেই পাবে। কিন্তু বাস্তবে একটি ওষুধও অনেক সময় পায় না।
চতুর্থত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলা হয়, কিন্তু হাসপাতালের মেশিন নষ্ট থাকায় সেগুলোও করা যায় না।
দালাল চক্র শুধু বড় হাসপাতালে নয়, উপজেলা ও জেলা হাসপাতালেও বিস্তৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছি। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থায়ীভাবে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ হাজার আনসার সদস্যকে শুধু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধেও তো বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তা হলে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে?
এখন কী বলব? ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’? অবশ্যই এসব অভিযোগ রয়েছে। শুধু আনসার নয়, সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতির সমস্যা আছে। আপনি একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন, সেটিও সময়ের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই আমি মনে করি, ব্যক্তিনির্ভর নয়, আমাদের সিস্টেমভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হবে।
আপনি নিজেও একজন চিকিৎসক। একজন চিকিৎসক হিসেবে জানতে চাই, উপজেলা বা প্রান্তিক এলাকায় কেন অনেক চিকিৎসক থাকতে চান না?
‘উপজেলায় পোস্টিং দিলে চিকিৎসক থাকেন না’ এই ধারণাটি একটি মিথ। সমস্যা আসলে অন্য জায়গায়। আমাদের পুরো সিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলায় পোস্টিং হলেও কেউ থাকেন না, আবার ঢাকায় পোস্টিং হলেও নিয়মিত অফিস করেন না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহি ছিল না। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
হাসপাতালগুলোতে এখনও ২৪ ঘণ্টা ল্যাবরেটরি সেবা বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। আর রাজধানীর বড় হাসপাতালের মতো সেবা কেন প্রান্তিক পর্যায়ে পাওয়া যায় না?
আমাদের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আসা প্রতিটি রোগী যেন একজন চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পান। বর্তমানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমন অবস্থায় রয়েছে যে আমাদের কার্যত শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। সবকিছু ভেঙে পড়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা নিয়ে অতীতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকার কি এমন কোনো নীতিমালা বিবেচনা করবে, যেখানে তৃতীয় পক্ষের কেনাকাটার সুযোগ রহিত করা যাবে?
বাংলাদেশই একমাত্র দেশ নয় যেখানে স্বাস্থ্য খাতে বিকেন্দ্রীকৃত কেনাকাটা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ব্যবস্থা রয়েছে।
সমস্যা কেনাকাটার পদ্ধতিতে নয়, বরং নিয়ম না মানায়। সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) এবং ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্টের (ই-জিপি) নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেই অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দুর্বল সুশাসন, তদারকির অভাব এবং জবাবদিহির সংকটও জড়িত।
বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বরিশালে বিভাগীয় পরিচালক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ কি?
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, চিকিৎসক, শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো পেশাগত পরিসরে দলীয় রাজনীতি থাকা উচিত নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশে গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুতেই দলীয়করণের প্রবণতা বেড়েছে।
দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। সরকারি চিকিৎসক রয়েছেন ৪০ হাজারেরও বেশি। কিন্তু ড্যাবের সদস্যসংখ্যা এর তুলনায় অনেক কম। ফলে ড্যাব বা অন্য কোনো রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত সংগঠন পুরো স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন ধারণাও অনেকাংশে একটি মিথ।
পদায়ন নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। দেশে ১,৫০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কেনাকাটা হয়, ৪০ হাজারের বেশি চিকিৎসক এবং সমসংখ্যক নার্সের পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি হয়। এর মধ্যে দুয়েকটি ঘটনায় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
হাম পরিস্থিতির মতো ভবিষ্যতে যাতে টিকা সংকট না হয়, সে জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? বর্তমানে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ আছে কি?
আমাদের ডাটাবেজ, সার্ভেইলেন্স সিস্টেম এবং ঘওঞঅএ-এর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে আগামী এক বছরের টিকার চাহিদা নির্ধারণ করেছি। কোন মাসে কোন টিকার কত প্রয়োজন হবে, তার পূর্ণ পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেখানে ঘাটতি ছিল, সেগুলো চিহ্নিত করে ইতিমধ্যে ক্রয়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় গুদাম ও মাঠপর্যায়ে টিকার মজুদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
মৌলিক সেবা নিশ্চিত হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে সরকারের পরিকল্পনা কী?
এটি পুরোনো রাজনীতির প্রশ্ন। আমরা বড় বড় স্বপ্ন দেখাতে বিশ্বাস করি না। আমরা বলতে চাই না যে আগামীকালই তাইওয়ান, জাপান বা কানাডার মতো স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করে ফেলব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি না, আমরা পরিকল্পনা করি।’
সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা শুধু এক বছরের পরিকল্পনা করছি না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পাঁচ বছরের একটি রূপরেখা নিয়ে কাজ করছি।
প্রথম বছরকে আমরা ভিত্তি তৈরির বছর হিসেবে দেখছি। প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো গড়ে তোলা, সিস্টেমকে সচল করা এবং মানুষের জন্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সময়ের আলো/এসএকে