গ্যাসের খরায় বাড়ছে দীর্ঘশ্বাস

রফিক রাফি

জাতীয়

দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে সারা দেশ। এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ)

2026-08-03T00:47:03+00:00
2026-08-03T00:47:49+00:00
 
  সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
গ্যাসের খরায় বাড়ছে দীর্ঘশ্বাস
রফিক রাফি
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম  আপডেট: ০৩.০৮.২০২৬ ১২:৪৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে সারা দেশ। এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। 

সব মিলিয়ে চাহিদার চেয়ে গ্যাস সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর বিরূপ প্রভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহক, শিল্প উদ্যোক্তা, পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসের চাপ না 

থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও গভীর রাতে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প খাতেও বাড়ছে উদ্বেগ। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিংও বেড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সকাল, দুপুর কিংবা সন্ধ্যা কোনো সময়ই ঠিকমতো গ্যাস মিলছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছে, না হলে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এতে মাসিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

গ্যাসের চাপ না থাকায় চরম সংকটে পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো। রাজধানী থেকে জেলা শহর সবখানেই গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ নেই। অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে সেখানেও দীর্ঘ লাইন।

রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মালিবাগ, বিমানবন্দর এলাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। কোথাও দিনের মধ্যে একাধিকবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইয়ের কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প মালিকদের দাবি, গ্যাস সংকটে উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানোসহ বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।

পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪শ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে সরবরাহ করা হয় সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এ ছাড়া ১৬০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ করা হয় দেশীয় কূপগুলো থেকে উত্তোলন করে। 

সব মিলিয়ে ২১০ থেকে ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস এখন সরবরাহ করা হচ্ছে। গত বছরের আগে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হতো। যত দিন যাচ্ছে দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদন কমছে। এ জন্য সরবরাহও কমছে। অপরদিকে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বন্ধ রয়েছে এবং সামিট গ্রুপের টার্মিনাল থেকেও ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়া যাচ্ছে। এসব কারণে সারা দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে।

তবে পেট্রোবাংলা বলছে, চলতি সপ্তাহেই গ্যাসের সংকট কেটে যাবে। শিগগিরই টার্মিনালটির একটি ইউনিট চালু হবে, তখন ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। তার পরের সপ্তাহেই দুটি ইউনিট থেকে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিদেশি কোম্পানি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির মেরামতে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। কারণ ছোট ঘটনা থেকে বড় দুর্ঘটনা হয়ে গেলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ জন্য মেরামতে সময় বেশি লাগছে।


এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সংকটের সমাধান করতে নতুন কূপ খনন, ওয়ার্ক ওভার, গভীর সমুদ্র ও স্থলভাগে অনুসন্ধানসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত সপ্তাহে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। 

এটি স্থাপন করতে দেড় থেকে দুই বছর লাগবে। স্থাপিত হলে আমদানিকৃত গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে। তবে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ক্রমাগত উৎপাদন কমে যাওয়া, ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক বছর ধরেই আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম বৃদ্ধি করে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন এর জের টানতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, জ্বালানি সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, নতুন কূপ খনন, পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি অপচয় ও অবৈধ সংযোগ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামতের জন্য দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। চলতি সপ্তাহেই আংশিক সরবরাহ চালু হবে। আগামী সপ্তাহে পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ শুরু হবে।

তিনি বলেন, চাহিদা অনুয়ায়ী দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস আহরণ করে সরবরাহ করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও একটি এলএনজি টার্মিানল কেনার অনুমোদন পাওয়া গেছে। চীনা কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব আনার চেষ্টা করা হবে। এতে ১৮ মাস সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, গত ১৫ বছরের সমস্যা বর্তমান সরকারের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা না করে এলএনজি আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে দেশকে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

সময়ের আলো/এসএকে



  বিষয়:   গ্যাস  দীর্ঘশ্বাস  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: