মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে মানুষকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, স্থানীয় উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি
সময়ের আলো : বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ইকবাল হাসান মাহমুদ : বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র কয়েক মাস হলো। জ্বালানি সক্ষমতা তো কয়েক মাসের বিষয় নয়। এটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার এত উন্নয়ন করেছে যে, উন্নয়নের জোয়ারে আমরা ভেসে গেছি। কিন্তু জ্বালানি খাতের সক্ষমতার জন্য কিছুই করেনি। শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করেছে, কিন্তু আমদানি করে এনে স্টোরেজ করার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিছু করেনি। এখন যা সংকট বা পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে সবই বিগত সরকারের রেখে যাওয়া, তাদের কর্মকাণ্ড। এখানে বিএনপি সরকার তো ইনভলভড না, দায়ীও না। এটার জন্য বর্তমান সরকারকে দোষারোপ করে তো লাভ নেই। এটা জনগণকে বুঝতে হবে। এ অবস্থার জন্য কে দায়ী তা জানতে হবে। এই অবস্থার উন্নতির জন্য সময় লাগবে, বিএনপি সরকারকে সেই সময় তো দিতে হবে। আমরা এই সংকট উত্তরণে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিএনপি সরকারের আন্তরিকতার কমতি নেই।
দেশে গ্যাসের সংকট রয়েছে, গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কী?
স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের জন্য নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমরা নতুন রিগ কিনছি, নুতন কূপ খনন করছি। অলরেডি আমরা অনুসন্ধান শুরু করে দিয়েছি। ইতিমধ্যে দুটি রিগের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আরও দুটির জন্য অর্ডার দেওয়া হবে। অথচ আওয়ামী সরকারের আমলে গত ১৭ বছর গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে কিছুই করা হয়নি।
নতুন ভাসমান টার্মিনালের চুক্তি হয়েছে, এটা কবে নাগাদ আসতে পারে?
এটা আসতে দুুটি উইন্টার (শীতকাল) লাগবে। সামনের শীতকাল এবং পরের শীতকাল, মানে ১৮ মাস লাগতে পারে।
পরিস্থিতির উন্নয়নে কী করছে সরকার?
অনেক বিষয় আছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। তারপরও আমরা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাধ্যমতো কাজ করছি। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের বারবার ডেকে কথা বলছি। তাদের বলছি, আমাদের গ্যাসের ও তেলের সংকট থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে। আজ ভারতের রাষ্ট্রদূতকে বলেছি, ভারতের সঙ্গে একটা পাইপলাইন আছে, সেখান থেকে ডিজেল আসে। তাদের বলেছি, আরও বেশি (ডিজেল) দেওয়ার জন্য। মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ কি বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে?
করতে হবে, বেসরকারি এবং সরকারি দুটোই করব। আমারা মিক্সড জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র করব।
সামনে কি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হবে?
দেব। যদি এখন না করি তারপরে ৩২ সালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে তখন কী করব? ভবিষ্যতের কথাও তো চিন্তা করতে হবে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে করা হবে।
চলমান গ্যাস সংকট আর কতদিন থাকতে পারে?
ইতিমধ্যে মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আর সাত-আট দিনের ভেতরে মোটামুটি একটা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে বলে আশাবাদী।
ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড কোনো সাবোটাজ মনে করেন কি না?
মধ্য সমুদ্রে থাকা টার্মিনালে সাবোটাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। এটা আমেরিকান কোম্পানির। এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা বলেছে, এটি দুর্ঘটনা।
দেশি কয়লা নিয়ে পরিকল্পনা কী?
আমরা কয়লাকে গ্রিন এনার্জি বানিয়ে ব্যবহার করব।
বিগত ১৭ বছরের অনিয়ম নিয়ে কোনো তদন্ত করা হচ্ছে কি না?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও করা হয়েছে। এতে লাভটা কী? ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার এমন সব চুক্তি করে দিয়েছে, এটা চাইলে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বের বড় বড় আইনজীবী দিয়ে চুক্তিগুলো করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তিগুলো ঠিকমতো দেখেছে বলেও মনে হয় না। আমাদের পক্ষেও কোনো বড় আইনজীবী ছিল না। এটা নিয়ে আদালতে গেলে আমরা হেরে যাব।
সেই চুক্তিগুলোর বিষয়ে নেগোসিয়েশন করা হচ্ছে কি না?
করা হচ্ছে, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে যতটুকু আদায় করা যায় আরকি। আমরা পারলে আজকেই বন্ধ করে দিতাম। কিন্তু জনগণ তো অন্ধকারে থাকতে চায় না।
বর্তমান গ্যাস সংকটের বিষয়ে কী বলবেন?
আগুন লেগে ভাসমান টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। কারখানায় গ্যাস পাচ্ছে না। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চলছে না। আমরা তেল দিয়ে বিদ্যুৎ চালিয়ে (উৎপাদন করে) যতটুক পারছি দেশের মানুষকে সরবরাহ করার চেষ্টা করছি। আশা করি, এফএসআরইউ এসে গেলে এটার (সংকটের) মাত্রা অনেক কমে যাবে।
ভারতের আদানির সঙ্গে চুক্তিতে বেশি দাম ধরা হয়েছে, আমাদের সক্ষমতা বাড়লে আমদানি কমানো সম্ভব কি না?
সক্ষমতা বাড়লে আস্তে আস্তে কমাব, একবারে কমানো যাবে না।
সারা দেশে গ্যাস চুরি ও সিস্টেম লস প্রতিরোধে পরিকল্পনা কী?
আমরা চেষ্টা করছি এটা কমানোর জন্য। কমানোর জন্য যে পদ্ধতি আমরা নিচ্ছি সেটাও তো মানুষ নিতে চাচ্ছে না। প্রিপেইড মিটার অনেকে নিতে চাচ্ছে না। মানুষকে সচেতন হতে হবে, এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ভূমিকা পালন করতে হবে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা আছে কি?
আমাদের বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইজাজ হোসেন, শামসুল আলমসহ অনেককে কাজে লাগানো হয়েছে। এর অর্থ দেশীয় মেধা আমরা কাজে লাগাতে চাইছি।
সংকটের মধ্যেই অনুমোদনহীন অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে অনেক বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ কী?
এটা নিয়ে আমরা পলিসি তৈরি করছি। সোলারে চার্জ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এটার জন্যও নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
সময়ের আলোকেও ধন্যবাদ।
সময়ের আলো/আআ