চলতি বছরের নভেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা থাকলেও পাবলিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব ও বৈরী আবহাওয়াসহ নানা কারণে চলতি বছরে ভোট আয়োজনের স্লট বা সময় সুযোগ মিলছে না ইসির। তাই পিছিয়ে আগামী বছরের জানুয়ারিতে শুরু হতে পারে স্থানীয় নির্বাচন। সরাসরি না বললেও আকার ইঙ্গিতে এমনটিই জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, আমরা তো বলেছি যে পরবর্তী মিটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করেন। কারণ আমাদের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বরে তারা বহু টাইট সিডিউল দেখিয়েছে। ওই সময়ে নির্বাচন করা অনেক কঠিন। নভেম্বর-ডিসেম্বরে যদি কোনো স্লট না পাই তা হলে জানুয়ারিতে হবে ইনশাল্লাহ। এখন এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউপি ভোট করতে হলে আগে ‘স্লট’ পেতে হবে। আজকে আমরা মূলত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছি। অন্য নির্বাচনের ব্যাপারেও আমরা আইন অনুযায়ী যখন যেটা করা প্রয়োজন তখন সেটা করব। আগে তো আমাকে স্লটটা পেতে হবে নির্বাচন করার জন্য। এবারে আমাদের স্পেশালিটি হচ্ছে পুরো নভেম্বর এবং ডিসেম্বরজুড়ে হচ্ছে পরীক্ষা। গ্যাপ খুবই কম পাওয়া গেছে। আমরা দুটো জায়গার কথা বলেছিলাম (গ্যাপ)। কিন্তু এখন আবার দেখতে হবে আমাদের আজকের প্রাপ্ত উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে যে ওগুলো আদৌ সম্ভব কিনা।
তিনি বলেন, আমরা জানুয়ারিতে ফাঁকা সময় পাচ্ছি কিছুটা। আপনারা এটাও জানেন যে, ৩ বা ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার রোজা শুরু। রোজা শেষ হওয়ার মাত্র একদিন পর থেকে আবার এই এসএসসি পরীক্ষা শুরু। এসএসসি শেষ হওয়ার পর ওই জুন মাসের ৬ তারিখে এইচএসসি শুরু। মাঝখানে আবার একটা সময় পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের এবারে স্পেসগুলো খুব টাইট। তো এই টাইট সময়ের মধ্যে কিভাবে আমরা সব একোমোডেট করব এটা নিয়েই আরও একটু সাইডলাইন ওয়ার্ক করার দরকার আছে। এর ঠিক তিন দিন আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিশেষ কমিশন সভা শেষে এই নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করার বিষয়ে জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, দেশের মোট ইউনিয়ন ৪ হাজার ৫৮০টি। এসব ইউনিয়নে সাত ধাপে ভোট করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য তারিখগুলো হলো— প্রথম ধাপের তারিখ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, ৩য় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর। ৪র্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি। ৫ম ধাপ আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি, ৬ষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল, ৭ম ধাপ ২৭ মে।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নিজ দফতরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল ও নভেম্বরের শেষের দিকে বা ডিসেম্বরে ভোট হতে পারে। এ জন্য আমরা বার্ষিক পরীক্ষা অ্যাডজাস্ট করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বলব। আমরা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করে এসে সচিবকে আমি সার্বিক প্রস্তুতি নিতে বলেছি।
তিনি বলেছিলেন, আমরা হয়তো সেপ্টেম্বরে তফসিল দিতে পারি। সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল দিলে কিছু কিছু এই বছর করতে পারব। বাকিগুলো আগামী বছর করতে হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ জানানোর পরে আপত্তি তোলেন সরকারের দুই মন্ত্রী। তাদের দাবি— সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই দিনক্ষণ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করেই নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করবে। নির্বাচন কমিশন আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। তার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচন করা। এক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর স্থানীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হবে।
এরপর গত ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে আজকের সভায় আমি যদি এক লাইনে কনক্লুশনটা বলি সবাই এটা সম্মত হয়েছেন, যে আমাদের এই নির্বাচনটা পারতপক্ষে ৬ জুনের আগেই সম্পন্ন করতে হবে, এইচএসসি পরীক্ষার আগে। এখানে কতগুলো বিষয় এসেছে বিশেষ করে শিক্ষা। ওনারা কতগুলো অনুরোধ আমাদের করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যাতে করে পরীক্ষাগুলো ব্যাহত না হয়।
এর আগে একই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি আছে। সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা মনে করি নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস। এই সময়ে আমরা নির্বাচন শুরু করার চেষ্টা করব। যতগুলো সম্ভব করব। সবকিছু মাথায় রেখে আগামী সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে তফসিল ও নভেম্বরে ভোট শুরুর কথা ভাবছি। এটাকে ধরেই আমরা এগোচ্ছি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখা-৩ এর তৈরি করা ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
মামলা, সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়নি। নতুন গঠিত আটটি ইউনিয়নসহ দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৮৬টি। এরমধ্যে চলতি বছরই ৩ হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
পৌরসভার রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের মোট ৩৩১টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী। আইনি জটিলতার কারণে ১১টি পৌরসভা এখনও নির্বাচন উপযোগী নয়। উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, নতুন পাঁচটি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০৩টি। কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী। অর্থাৎ আগামী জানুয়ারিতে ভোট শুরু হলে জুন মাসের মধ্যে ইসিকে প্রায় ৪ হাজার ইউপি, ৩২১টি পৌরসভা, ৫০৩টি উপজেলা ও ৬৪টি জেলা পরিষদ ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করতে হবে।
উল্লেখ্য ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ ছাড়া ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদও হয়ে পড়েছে জনপ্রতিনিধিহীন। ফলে দুইবছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে