সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার উদ্বেগে ফেলেছে পুলিশ প্রশাসনকে। বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। একই বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বিষোদগার করা হচ্ছে। অনেককে বিগত সরকারের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সদ্য পদায়ন হওয়া কর্মকর্তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির চেষ্টা চলছে। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া গত দুই বছর ধরে নানা ধরনের চড়াই-উতরাই ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ বাহিনী। বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাহিনীটিকে। বাহিনী পুনর্গঠন, প্রশাসনিক রদবদল, বদলি এবং বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন অনেক পুলিশ সদস্য। এর সঙ্গে চাকরির অনিশ্চয়তাও তাড়া করছে অনেককে। বদলি ও পদোন্নতি কেন্দ্র করে তদবিরের চাপও সামলাতে হচ্ছে বাহিনীকে।
একদিকে জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সদস্যদের মনোবল পুনরুদ্ধার, পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলে বিতর্কিত পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে নতুন সদস্য নিয়োগ- সব মিলিয়ে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে পুলিশকে। একই সঙ্গে অতীতে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিতদের প্রত্যাশা পূরণেও সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিভিন্ন স্তরের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে পুলিশ বাহিনী হারানো মনোবল অনেকটাই ফিরে পেলেও এখনও প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব’ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ ধৈর্যের পরিচয় দিতে হচ্ছে। ন্যূনতম বল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হচ্ছে।
আবার ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক বদলি করা হয়। নতুন কর্মস্থলে সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আগেই অনেককে আবার বদলির আদেশ দেওয়া হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ২০২৫ সালে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর নতুন ধরনের চাপের মুখে পড়েছে পুলিশ। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। বদলি ও পদোন্নতি কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরও করা হচ্ছে।
বিগত ১৬ বছরে পুলিশের অনেক সদস্য চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। পদোন্নতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অনেকেই ন্যায্য পদোন্নতি এবং পছন্দের কর্মস্থলে বদলির প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু পদের তুলনায় প্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকেই হতাশ হচ্ছেন।
আবার বদলি বা পদোন্নতি পাওয়ার পর অনেক পুলিশ সদস্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ্য করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এর ফলে কারও কারও বদলি স্থগিতও হয়ে যাচ্ছে। এতে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সম্প্র্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। গত ৩ আগস্ট দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তি বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিগত সরকারের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন।
শুধু বিগত সরকারের আমলে চাকরি করার অজুহাতে পেশাদার, সৎ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হলো পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোবল দুর্বল করা, সদ্য পদায়ন হওয়া কর্মকর্তাদের বিতর্কিত করা, পুলিশ বাহিনীকে সামগ্রিকভাবে দুর্বল করা, জনগণের কাছে বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা।
এদিকে গত ৬ আগস্ট রাজধানীতে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার ও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোসলেহ উদ্দীন আহমদ পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, সরকার ও পুলিশকে যারা বিতর্কিত করতে চায়, তাদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
পুলিশ সদর দফতরের হুঁশিয়ারি : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অপপ্রচার চালানোর বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।
শুক্রবার পুলিশ সদর দফতরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, এ ধরনের অপপ্রচার অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ এ ধরনের অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের দেশি-বিদেশি দোসররা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা, পুলিশ বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ন করা এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ায় এবং অপপ্রচারকারীদের কোনো অন্যায় তদবির আমলে না নেওয়ায় একটি অসন্তুষ্ট মহল মনগড়া তথ্য দিয়ে এ ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও দাবি করা হয়, অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত থাকার তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি দফতরে অন্যায় তদবির করা এবং অপপ্রচার না চালানোর শর্তে অর্থ দাবি করারও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে