বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। পর্যটনের গুরুত্ব, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নে এর ভূমিকা তুলে ধরতেই প্রতি বছর এ দিবস পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘পর্যটনকে নতুনভাবে সাজাতে ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’।
বাংলাদেশেরও রয়েছে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, নদী, হাওড়, চা-বাগান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে এসব আকর্ষণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সহজে তুলে ধরার পাশাপাশি সেবার মানও বাড়ানো সম্ভব।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বলছে, বিশ্ব পর্যটন দিবসটি সামনে রেখে দেশের পর্যটন খাতকে পরিকল্পিত ও আধুনিক শিল্পে রূপ দিতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেও নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ।
জাতিসংঘের পর্যটনবিষয়ক সংস্থা ইউএন ট্যুরিজমের মতে, পর্যটন খাত দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গন্তব্য নির্বাচন, ভ্রমণ পরিকল্পনা, বুকিং, গ্রাহকসেবা ও পর্যটনকেন্দ্র পরিচালনায় নতুন সুযোগ তৈরি করছে। পর্যটকের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার পাশাপাশি এআই পর্যটন ব্যবসার দক্ষতাও বাড়াতে পারে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা পর্যটনের সুযোগগুলোকে পরিকল্পিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপ দিতে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, আমরা ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে নিয়ে একটি ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছি।
সুন্দরবন, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগান, নদী-হাওড়, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় স্থাপনাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকার কক্সবাজারকে একটি আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পর্যটনে তথ্য ও ডিজিটালাইজেশনে জোর : পর্যটন খাতের সঠিক চিত্র পেতে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি এবং ডিজিটালাইজেশনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সরকার।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনসচিব ফাহমিদা আখতার জানান, পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নিরূপণে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
এর মাধ্যমে পর্যটনের কারণে কর্মসংস্থান, ভোগ ও বিনিয়োগসহ অর্থনীতিতে সরাসরি কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা আরও সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক অবদান পরিমাপের জন্য পর্যাপ্ত ও তাৎক্ষণিক তথ্য না থাকায় নীতিনির্ধারণ ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সমস্যা হয়। এ ঘাটতি দূর করতে টিএসএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটকরা বিভিন্ন গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য, পর্যটনসেবা, বুকিং ও অন্যান্য সুবিধা এক জায়গা থেকে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পর্যটনকেন্দ্রে ডিজিটাল তথ্যসেবা, রিয়েল-টাইম পর্যটন ড্যাশবোর্ড এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিপণনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প : বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামান সময়ের আলোকে জানান, চিহ্নিত পর্যটন সম্ভাবনার মধ্য থেকে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প অগ্রাধিকার দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান ৮ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের যে হিসাব রয়েছে, তা দ্বিগুণ করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পর্যটনের সুফল শুধু বড় শহর বা নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে আটটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী, সমুদ্র ও ব্লু ট্যুরিজম, পাহাড় ও অ্যাডভেঞ্চার, চা ও প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব, নদী ও ক্রুজ, গ্রাম ও কমিউনিটি ট্যুরিজম এবং মাইস ও বিশেষায়িত পর্যটন।
বছরের শেষে মাস্টারপ্ল্যান : বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মো. মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী সময়ের আলোকে জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান চলতি বছরের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যটকদের সর্বোচ্চ মানের সেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার পর এর আলোকে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সুযোগ-সুবিধা দ্রুত উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অধীনে একটি কৌশলগত পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হলেও বিভিন্ন কারণে এর বাস্তবায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। পরে এটি পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
আকর্ষণ থেকে অভিজ্ঞতা : দেশে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটন আকর্ষণগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে প্রায় ৩ কোটি অভ্যন্তরীণ পর্যটক রয়েছে। তবে বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে গড়ে অবস্থানের সময় প্রায় ২ দশমিক ৮ দিন। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই বিদেশি পর্যটক বাড়বে না। পর্যটনকেন্দ্রে মানসম্মত টয়লেট, পার্কিং, জরুরি সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, বহুভাষিক গাইড, ডিজিটাল তথ্যসেবা এবং সহজ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি রাফিউজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, অবকাঠামোর পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা তৈরির দিকে নজর দিতে হবে।
টোয়াবের সাবেক পরিচালক তসলিম আমিন শোভনও গন্তব্যভিত্তিক ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক বিপণন ও নতুন পর্যটন পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
১৯ দফা পরিকল্পনা : পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ১৯টি অগ্রাধিকার সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে আগামী তিন বছরের মধ্যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র সমন্বিতভাবে উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানো এবং ভিসা ও বিমানবন্দরে প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পর্যটন গন্তব্য খোঁজা, বুকিং, অর্থ পরিশোধ ও সেবা সম্পর্কে মতামত দেওয়ার ব্যবস্থা; হোম স্টে ও কমিউনিটি ট্যুরিজম সম্প্রসারণ; সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজম; গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন এবং ঢাকার চারপাশে সার্কুলার ট্যুরিস্ট ওয়াটারওয়ে চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের পর্যটন খাতে অর্থায়ন ও বাজারসুবিধা বাড়ানো, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষণ, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট ও রিয়েল-টাইম পর্যটন ড্যাশবোর্ড চালু এবং আন্তর্জাতিক বিপণন জোরদারেরও প্রস্তাব রয়েছে।
সরকার পর্যটনকেন্দ্রের পরিকল্পনা, সড়ক, ইউটিলিটি, স্যানিটেশন, নিরাপত্তা, নীতিমালা, ব্র্যান্ডিং, ভিসা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সংরক্ষণে নেতৃত্ব দেবে। অন্যদিকে হোটেল-রিসোর্ট, পর্যটন অভিজ্ঞতা, পরিবহন, ট্যুর অপারেশন, ডিজিটাল বুকিং ও সেবা উদ্ভাবনে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে মাস্টারপ্ল্যান, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
সময়ের আলো/এসএকে