নদীর কান্না শোনা যায়

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

‘আমার চোখ-মুখ তারই জ্যোতি, সুন্দরের জ্যোতি ফুটে উঠেছে— দোল পূর্ণিমার রাতে বুড়িগঙ্গায় যেমন করে জোয়ার এসেছিল তেমনি করে।’ কবি কাজী

2026-09-27T01:17:48+00:00
2026-09-27T01:17:48+00:00
 
  রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১২ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
নদীর কান্না শোনা যায়
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৭ এএম 
ছবি : শেখ ফেরদৌস
‘আমার চোখ-মুখ তারই জ্যোতি, সুন্দরের জ্যোতি ফুটে উঠেছে— দোল পূর্ণিমার রাতে বুড়িগঙ্গায় যেমন করে জোয়ার এসেছিল তেমনি করে।’ কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রিয় নারীকে তুলনা করেছিলেন ঢাকার প্রাণ ‘বুড়িগঙ্গা’ নদীটির সঙ্গে।

এ নদীতে এখন আর প্রাণ নেই। একসময় যে নদী ছিল ঢাকার সৌন্দর্য, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের অন্যতম কেন্দ্র, সেই বুড়িগঙ্গা এখন দখল ও দূষণের ভারে বিপর্যস্ত। নদীর কালচে পানি, ভাসমান বর্জ্য আর দুর্গন্ধ যেন সেই অতীতের সঙ্গে নির্মম বৈপরীত্য তৈরি করেছে। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, দেশের অসংখ্য নদীর চিত্র প্রায় একই। কোথাও নদীর বুক দখল করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা, কোথাও শিল্প-কারখানার বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য সরাসরি পড়ছে নদীতে। কোথাও আবার পলি জমে নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। ফলে নদী হারাচ্ছে নাব্য, জীববৈচিত্র্য ও স্বাভাবিক প্রবাহ। অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, অনেক নদী পরিণত হচ্ছে সরু জলধারায়।

আজ বিশ্ব নদী দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয়। নদীর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে দিবসটি যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ। 

কারণ নদী শুধু প্রকৃতির অংশ নয়; দেশের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জনজীবন ও পরিবেশের সঙ্গে নদী অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদী দখল বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। নদীর তীর, চর ও প্রবাহপথ দখল করে গড়ে উঠছে বসতি, দোকানপাট, শিল্প-কারখানা, গুদাম ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও নদীর তীর ভরাট করে সড়ক বা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এসব দখলের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমে যায় এবং পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। 

২০২৬ সালের  একটি সংসদীয় তথ্যে দেশে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ নদী দখলদারের তথ্য জানানো হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আগের একটি তালিকায় ৪৮ জেলার ৪৯ হাজার ১৬২ জন অবৈধ দখলদারের তথ্য ছিল। তালিকা তৈরির পদ্ধতি ও সময়ের পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে; তবে উভয় তথ্যই সমস্যাটির ব্যাপকতা নির্দেশ করে।

দখলের পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ফেলা ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে নদীর তলদেশে পলি ও বর্জ্য জমে প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দূষণে বিপর্যস্ত ঢাকার নদী
ঢাকার চারপাশের নদী-নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী দীর্ঘদিন ধরে দূষণ ও দখলের শিকার। সেখানে শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক, বাজারের বর্জ্য ও নৌযানের তেলকে দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বুড়িগঙ্গার তীরে সদরঘাট, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, জিঞ্জিরা ও শ্যামপুর এলাকায় দূষণের চাপ বিশেষভাবে বেশি বলে ওই মূল্যায়নে উঠে এসেছে। নদীর তীরে ঘনবসতি ও শিল্প-কারখানার বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঢাকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের তুরাগ একসময় ছিল স্বচ্ছ পানি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। কিন্তু নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দখল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় নদীটির পরিবেশগত অবস্থা বদলে গেছে।


গবেষণায় তুরাগের বিভিন্ন স্থানে পানির মানের অবনতি এবং মানবসৃষ্ট কারণে নদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নদ-নদীর প্রবাহপথ পরিবর্তন, দখল এবং পৌর ও শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ এর অন্যতম কারণ।

নদীটি পুনরুদ্ধার ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগের কথাও বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে পানিসম্পদ ও পরিবেশ উপদেষ্টা তুরাগসহ ঢাকার চার নদ-নদী— বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু—পুনরুদ্ধার ও দূষণমুক্ত করার কর্মপরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।

নদ-নদীর পানিতে দূষণের পাশাপাশি এখন নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পানি ও তলানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গার দূষণের মাত্রা বেশি ছিল।

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী শিল্পাঞ্চল ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিল্প-কারখানার বর্জ্য, নগরবর্জ্য ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট দূষণের চাপ নদীটির ওপর দীর্ঘদিনের। এক গবেষণায় শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে বিভিন্ন দূষণকারী রাসায়নিক এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। নদীটির দূষণের সঙ্গে শিল্প-কারখানার নিঃসরণ ও নগরায়ণের চাপের সম্পর্কও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু রাসায়নিক দূষণ নয়, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর পানিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। 

চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলীও দূষণের বাইরে নয়। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও শিল্প-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত এই নদী অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিল্পবর্জ্য, নগরবর্জ্য, প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণের পাশাপাশি নদীটির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকও শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় নদীর নিম্নপ্রবাহের দিকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি এবং এর সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, নদীদূষণ এখন শুধু চোখে দেখা কালো পানি বা ভাসমান বর্জ্যরে সমস্যা নয়। দূষণের এমন উপাদানও নদীতে ঢুকছে, যা খালি চোখে দেখা যায় না এবং দীর্ঘমেয়াদে জলজপ্রাণী ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়েই নদীর প্রবাহ ও পানি সম্পদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নদী অববাহিকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম প্রবাহ ছিল এবং বৈশ্বিক নদীপ্রবাহ কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শুষ্ক অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশের মতো নদীনির্ভর দেশে তাই নদী রক্ষা শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি পানি, খাদ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়ও।

বাংলাদেশে নদী রক্ষার জন্য আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩-এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো— নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প-কারখানার দূষণ এবং অবৈধ স্থাপনা প্রতিরোধ করা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। ২০১৯ সালে উচ্চ আদালত দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আনে। কিন্তু আইন, আদালতের নির্দেশনা ও বিভিন্ন প্রকল্পের পরও নদী রক্ষার বাস্তব চিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। নদী রক্ষায় নির্দেশনা ও সুপারিশ অনেক হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে— এমন চিত্র বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়েও ঢাকার নদীগুলো রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখা সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন। তিনি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।


এ বিষয়ে নদী নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, নদী দখল ও দূষণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে একদিকে যেমন নাব্য কমে, অন্যদিকে দূষিত বর্জ্য নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট করে। নদী রক্ষায় শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল বন্ধ, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, নদীকে শুধু পানি প্রবাহের জায়গা হিসেবে দেখলে হবে না। নদীকে ঘিরে মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। নদী ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পুরো পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর পড়ে। তাই নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   নদী  কান্না  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: