হুথিদের হামলা প্রলয়ংকরী যুদ্ধের সংকেত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা নতুন করে প্রলয়ংকরী যুদ্ধের সংকেত দিচ্ছে। অলৌকিক কিছু না ঘটলে শিগগিরই আরও বৃহত্তর ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ

2026-08-09T05:13:39+00:00
2026-08-09T05:13:39+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হুথিদের হামলা প্রলয়ংকরী যুদ্ধের সংকেত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১৩ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা নতুন করে প্রলয়ংকরী যুদ্ধের সংকেত দিচ্ছে। অলৌকিক কিছু না ঘটলে শিগগিরই আরও বৃহত্তর ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। 

গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সামরিক অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথি বাহিনী। বছরের পর বছর যুদ্ধবিরতি বিরাজ করার পর এই প্রথম এমন বড় হামলায় অন্তত ৩০ জন সরকারি সৈন্য নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ হাদরামাউত এবং মারিবে সরকারি সামরিক শিবির ও সৈন্যদের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। 

আলজাজিরা লিখেছে, বিদ্রোহী হুথি গোষ্ঠী ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতে এটি এক বড় মাত্রার উত্তেজনার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হুথি বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে দাবি করেন, তাদের হামলায় শত শত সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক সামরিক শিবির ও অস্ত্রাগার ধ্বংস হয়েছে। সৌদি আরব ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি বাহিনী রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সরকারের পক্ষ নিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বে জোট যুদ্ধে নামে। গত কয়েক বছরে যুদ্ধের তীব্রতা অনেক কমে এলেও, ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন ছেড়ে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনী ও দক্ষিণের কিছু গোষ্ঠী নিজেদের শক্তি সংহত করছে। অন্যদিকে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুথি বাহিনী গত মাসে সৌদি বন্দরে নৌ অবরোধ ঘোষণা করা এবং বাব-আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলা চালিয়ে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে।  

হুথি মুখপাত্র সারি বলেন, সরকারি বাহিনী এই হামলার জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে হুথি বাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।

আলজাজিরা লিখেছে, মারিব ও হাদরামাউতে হামলা ইয়েমেনের সংঘাতে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইয়েমেন আবার বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সানাবাসী আবদুল রহমান সালেহ বলেন, এখন যুদ্ধ শুধু আশঙ্কা নয় বরং বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দিন সানাতে বারবার বিস্ফোরণের শব্দ শুনছি। সংবাদে মৃত ও আহতের সংখ্যা দেখছি। প্রতিটি পক্ষ নিজেদের হামলা নিয়ে গর্ব করছে। মনে হচ্ছে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগের দিনগুলো ফিরে এসেছে। প্রতিটি পক্ষ প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার মনে হয়, এবার কোনো কারণে যুদ্ধ না বাধলে তা অলৌকিক ঘটনা হবে।

রাজনৈতিক ও সামরিক গবেষক ফুয়াদ মুসসেদের বিশ্লেষণ হলো, হুথিদের এই হামলা প্রমাণ করে যে তারা সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। হুথিদের বার্তা স্পষ্ট। ইয়েমেনের ভেতরে ও বাইরে দুজায়গাতেই তারা উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। দেশের ভেতরে হামলা চালানোর পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ ও সৌদি স্থাপনাগুলোয় আঘাত হানছে। ফলে এতদিনে বিরাজ করা ‘শান্তিও নয়, যুদ্ধও নয়’ এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির অবসান হয়েছে।

২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে বড় ধরনের লড়াই বন্ধ ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে উভয়পক্ষই স্থায়ী সমাধানের বদলে সামরিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, হুথিদের সীমান্ত পেরিয়ে হামলা বাড়ানোর অর্থ হলো দুপক্ষের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা আর কাল্পনিক নয়। এখনও উভয়পক্ষের সংযত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি নতুন হামলা সেই সুযোগ আরও কঠিন করে তুলছে। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে নতুন করে বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত অনেক বেশি।

এদিকে সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য শেখ ওসমান মাজালি বলেন, যতদিন ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়া’ ইয়েমেন ও এ অঞ্চলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে ততদিন শান্তি, স্থিতিশীলতা বা উন্নতির কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাদের মোকাবিলা ও পতন ঘটানো এবং জনগণের ওপর তাদের অত্যাচার বন্ধ করাই একমাত্র পথ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি বলেন, এখন ইয়েমেনে শান্তির কথা বলা অর্থহীন। বৃহস্পতিবারের হামলার মাধ্যমে হুথি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তাদের কাছে যুদ্ধই প্রধান। বছরের পর বছর শান্তি আলোচনা চলছে, কিন্তু ওই সময়টুকু তারা অস্ত্র সংগ্রহ ও তৈরিতে কাজে লাগিয়েছে। এখন তারা দেশের ভেতরকার চাপ সামলানোর পাশাপাশি ইসরাইল ও সৌদি আরব পর্যন্ত হামলা চালানোর সামর্থ্য রাখে। তাদের যুদ্ধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা এখন সহজ নয়। 

তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সৌদি আরব হুথিদের শান্তি প্রস্তাব গ্রহণের জন্য অনেক বেশি সময় দিচ্ছেন। পক্ষান্তরে হুথিদের দাবি সানা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সৌদি সমর্থিত কোনো বাহিনী বা সামরিক ইউনিট ইয়েমেনে থাকতে পারবে না। আল-হুরাইবি সতর্ক করে বলেন, হুথিদের হামলার জবাবে সরকার বা সৌদি আরবের নীরবতাকে কৌশলগত ধৈর্য বললে ভুল হবে। এই নীরবতা দুর্বলতার চিহ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জনগণের আস্থা হারিয়ে যাবে।

ইয়েমেনের তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ প্রদেশ মারিব আবারও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আদেল দাশেলা বলেন, হাদরামাউত ও মারিবে হামলা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হুথি বাহিনী মারিবের তেল-গ্যাস অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের স্থলযুদ্ধ এখন সন্নিকটে। কোনো অলৌকিক ঘটনা না ঘটলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হতে বেশি দিন বাকি নেই।

হুথির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সীমানায় কোনো সৌদি সামরিক উপস্থিতি তারা মেনে নেবে না। তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে প্রতিরোধ করা তাদের ন্যায্য অধিকার। দাশেলা আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের সামর্থ্যে হুথিদের এগিয়ে রাখলেও, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে সহিংসতা হবে ভয়াবহ। সর্বত্র লড়াই ছড়িয়ে পড়লে তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই এবারের যুদ্ধ আগের মতো হবে না। এটা হবে আরও রক্তাক্ত।

আলজাজিরা আরও লিখেছে, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার সামরিক জবাব দেওয়ার বদলে উত্তেজনা কমানোর পথটুকু এখনও বাঁচিয়ে রাখছেন। আহমেদ নাগি বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার এখনও সংযত নীতি বজায় রাখছেন।

কিন্তু এই নীতি কতদিন চলবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে হুথিদের হামলা বাড়তে থাকলে শক্তহাতে জবাব দেওয়ার চাপ বাড়বেই। সীমিত আকারের হামলা নাকি পুরোপুরি নীতি পরিবর্তন সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, নীরব থাকার সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   হুথি  হামলা  প্রলয়ংকরী যুদ্ধ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: