সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের নতুন ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলে জানিয়েছে আঙ্কারা। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার (৮ আগস্ট) দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে বলেন, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
গত শুক্রবার মক্কায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করেন। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
হাকান ফিদান চুক্তিটিকে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে ‘প্রযুক্তিগতভাবে’ তুলনা করেছেন। ন্যাটোর এই ধারায় একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে চুক্তির আওতায় কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বলে জানান ফিদান। আক্রান্ত দেশকে সহায়তার আবেদন করতে হবে এবং কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তা জানাতে হবে। এই সহায়তা গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তা থেকে শুরু করে গোলাবারুদ বা সামরিক ইউনিট মোতায়েন পর্যন্ত হতে পারে।
চুক্তির আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি গঠন করা হবে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানরা থাকবেন। পাশাপাশি সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া তিন দেশ যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, লজিস্টিক সহযোগিতা, হুমকি মূল্যায়ন এবং সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। ফিদান বলেন, মক্কায় তিন দেশের নেতাদের আলোচনায় সামরিক প্রযুক্তি বিনিময় ও একে অপরের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা থেকে কীভাবে সুবিধা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, চুক্তির প্রস্তুতি প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে চলছিল। তাই বর্তমান ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার কারণে এটি হঠাৎ করে করা হয়নি।
অন্যদিকে তুরস্কের আশ্বাসের পরও কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা সৌদি আরবকে নতুন অংশীদারদের ওপর নিরাপত্তার জন্য নির্ভর না করার সতর্কতা দিয়েছেন। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য মাহমুদ নবভিয়ান বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে— এমনটা মনে করা ঠিক হবে না।
একই কমিশনের আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি চুক্তিটিকে ‘কাগুজে চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সরাসরি চুক্তিটির কথা উল্লেখ না করলেও আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিজেদের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানান। তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন।
ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ এই চুক্তি। এই উদ্যোগ শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। প্রয়োজনে আরও দেশকে এর আওতায় আনা হবে।
ফিদান আরও জানান, কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে মিসরকে তিনি ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কিছু কারিগরি বিষয় সমাধান হলে মিসরও চুক্তিতে যোগ দিতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে সংকটের সময় তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে, সে বিষয়ে এখনো বেশ কিছু বাস্তব বিষয় নির্ধারণ করা বাকি রয়েছে। পরিকল্পিত কমিটি, স্থায়ী সচিবালয় এবং সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় চুক্তিটি শুধু পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জোটে রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সময়ের আলো/কেএইচ