‘বুমার’, ‘মিলেনিয়াল’ কিংবা ‘জেন-জি’— প্রজন্মভিত্তিক এসব পরিচিতি এখন বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু এসব নামের শুরু কীভাবে? কে দিয়েছিলেন এসব নাম? আর কেনই বা প্রজন্মগুলোর বয়সসীমা এতটা নির্দিষ্ট? প্রজন্মের পরিচয় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হওয়া আন্দোলনে জেন-জির বড় ভূমিকা সামনে আসার পর প্রজন্মটির নাম ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে।
প্রজন্মের ধারণার শুরু
সমাজকে বিভিন্ন প্রজন্মে ভাগ করার ধারণা প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো। উনিশ শতকে ফ্রান্স ও ইতালির চিন্তাবিদেরা একটি প্রজন্মের মেয়াদ নির্দিষ্ট কয়েক বছর ধরে হিসাব করার চেষ্টা করেছিলেন। জার্মান ইতিহাসবিদেরা আবার মনে করতেন, প্রজন্ম শুধু সময়ের ব্যবধান নয়; বরং একই ধরনের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের একটি গোষ্ঠী। জার্মানিতে কাজ করা হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মানহাইম এ দুই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেন। ১৯২৭-২৮ সালের তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য প্রবলেম অব জেনারেশনস’-এ তিনি বলেন, শুধু একই সময়ে জন্মালেই একটি প্রজন্ম তৈরি হয় না। বরং যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকটের মতো বড় কোনো ঘটনা তরুণ বয়সে মানুষের চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করলে একটি প্রজন্মের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়।
১৯৯১ সালে মার্কিন লেখক উইলিয়াম স্ট্রস ও নিল হাও তাদের ‘জেনারেশনস’ বইয়ের মাধ্যমে প্রজন্মের এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘মিলেনিয়াল’ শব্দটিকেও ব্যাপক পরিচিতি দেয় তাদের কাজ।
‘লস্ট জেনারেশন’ থেকে নামকরণ
‘লস্ট জেনারেশন’ ছিল প্রথম দিকের বহুল পরিচিত প্রজন্মের নাম। ১৮৮৩ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তরুণ ছিল। মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্মৃতিকথা ‘আ মুভেবল ফিস্ট’-এ বলা হয়েছে, ফ্রান্সে একটি গাড়ির গ্যারেজের মালিক এক তরুণ মেকানিকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তার প্রজন্মকে ‘লস্ট জেনারেশন’ বলেছিলেন। লেখিকা গারট্রুড স্টেইন পরে প্যারিসে থাকা হেমিংওয়ে ও তার সমসাময়িক মার্কিন লেখকদের উদ্দেশে একই শব্দ ব্যবহার করেন। হেমিংওয়ে পরে তার ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ উপন্যাসে এই কথাটি উদ্ধৃত করেন। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মের পরিচিতি হয়ে যায় ‘লস্ট জেনারেশন’।
‘সাইলেন্ট’ ও ‘গ্রেটেস্ট’ জেনারেশন
১৯২৮ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে ‘সাইলেন্ট জেনারেশন’ নাম দেয় টাইম ম্যাগাজিন। ১৯৫১ সালের একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে তরুণ আমেরিকানদের তুলনামূলক নীরব ও সংযত থাকার বিষয়টি তুলে ধরে এই নাম দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ১৯০১ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে ‘গ্রেটেস্ট জেনারেশন’ নামে পরিচিত করেন মার্কিন টেলিভিশন সাংবাদিক টম ব্রোক। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য গ্রেটেস্ট জেনারেশন’ বইয়ে মহামন্দার সময় শৈশব কাটানো এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিনদের জীবন তুলে ধরা হয়।
‘বেবি বুমার’ নামের পেছনে জন্মহার
‘বেবি বুমার’ নামটি অন্যগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রম। এটি কোনো লেখক বা সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে আসেনি; বরং একটি পরিসংখ্যান থেকে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার হঠাৎ বেড়ে যায়। ১৯৫৭ সালে জন্মের সংখ্যা আরও বাড়ে এবং ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তা উচ্চ পর্যায়ে থাকে। এই সময়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া মার্কিন প্রজন্মই ‘বেবি বুমার’ নামে পরিচিত হয়।
তবে এই নামটি মূলত মার্কিন বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই সময়ের জন্ম নেওয়া মানুষকে ‘বেবি বুমার’ বলা সবসময় যথাযথ নয়।
‘জেনারেশন এক্স’ এল যেভাবে
‘জেনারেশন এক্স’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেন ডেভারসন ও চার্লস হ্যাম্বলেট ব্রিটিশ কিশোরদের নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেন, যার নাম ছিল ‘জেনারেশন এক্স’। তবে তখন শব্দটি প্রজন্মের নাম হিসেবে জনপ্রিয় হয়নি। ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ পাঙ্ক সংগীতশিল্পী বিলি আইডল তার মায়ের বইয়ের তাক থেকে বইটি খুঁজে পান এবং নিজের ব্যান্ডের নাম দেন ‘জেনারেশন এক্স’।
পরে কানাডীয় লেখক ডগলাস কাপল্যান্ড ১৯৯১ সালে তার উপন্যাস ‘জেনারেশন এক্স : টেলস ফর অ্যান অ্যাক্সিলারেটেড কালচার’-এ নামটি ব্যবহার করেন। বইটি জনপ্রিয় হওয়ার পর ‘জেনারেশন এক্স’ প্রজন্মের স্থায়ী পরিচিতি পায়।
‘মিলেনিয়াল’ নামের কারণ
‘মিলেনিয়াল’ নামটি জনপ্রিয় করেন উইলিয়াম স্ট্রস ও নিল হাও। ১৯৮২ সালে জন্ম নেওয়া শিশুরা ২০০০ সালে মার্কিন হাইস্কুল থেকে স্নাতক হবে— এই হিসাব থেকেই ‘মিলেনিয়াল’ নামটি আসে।
‘জেনারেশন ওয়াই’ নামটি আগে ব্যবহৃত হলেও ‘মিলেনিয়াল’ নামটিই শেষ পর্যন্ত বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
‘জেন-জি’র কোনো লেখক নেই
‘জেন-জি’ নামটির পেছনে কোনো লেখক, বই বা বিশেষ ব্যক্তি নেই। ‘জেনারেশন ওয়াই’-এর পরের অক্ষর হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ‘জেড’ ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মানুষকে জেন-জি বলা হয়।
অস্ট্রেলীয় পরামর্শক মার্ক ম্যাকক্রিন্ডল পরে ল্যাটিন বর্ণমালার পরিবর্তে গ্রিক বর্ণমালা ব্যবহার করে পরবর্তী প্রজন্মকে ‘জেনারেশন আলফা’ এবং এরপর ‘জেনারেশন বেটা’ নাম দেন।
নামের পেছনে সময়ের বড় ঘটনা
প্রতিটি প্রজন্মের নামের সঙ্গে কোনো না কোনো বড় ঘটনা বা প্রযুক্তির সম্পর্ক রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ‘লস্ট জেনারেশন’, মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ‘গ্রেটেস্ট জেনারেশন’, যুদ্ধ ও মহামন্দার সময় বেড়ে ওঠা থেকে ‘সাইলেন্ট জেনারেশন’ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী জন্মহারের উল্লম্ফন থেকে ‘বেবি বুমার’ নাম এসেছে। ‘জেনারেশন এক্স’ ব্যক্তিগত কম্পিউটারের উত্থানের সময় বড় হয়েছে। মিলেনিয়ালরা ইন্টারনেটের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে; তাদের অনেকেই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সময় স্কুল-কলেজে ছিল এবং বয়স্কদের একটি অংশ ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় কর্মজীবনে প্রবেশ করে।
আর জেন-জি জন্ম থেকেই স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মধ্যে বেড়ে উঠেছে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এই প্রজন্মের অনেকের স্কুল ও কলেজজীবনও ব্যাহত হয়েছে।
তবে এসব প্রজন্মের নাম ও বয়সসীমা মূলত মার্কিন সমাজ ও ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বিশ্বায়ন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে নামগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও সব দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা যে একই, তা নয়।
সময়ের আলো/কেএইচ