মানুষ সাধারণত অর্থ-সম্পদ হারানো, ব্যবসায় লোকসান, চাকরি হারানো কিংবা সামাজিক মর্যাদা কমে যাওয়াকে ক্ষতি মনে করে। কিন্তু পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে এসব ক্ষতি চূড়ান্ত ক্ষতি নয়। প্রকৃত ক্ষতি হলো এমন কিছু হারিয়ে ফেলা, যার পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনেই ভয়াবহ।
পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের পরিচয় তুলে ধরে তাদের ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বলা হয়েছে। তারা কারা? কী কারণে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে? কোরআনের আয়াতের আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক—
১. অঙ্গীকার ভঙ্গকারী
আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং তাঁর নির্দেশিত সম্পর্ক ছিন্ন করা মানুষের বড় ক্ষতির কারণ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে; তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭)।
২. শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি
আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থির করে, সে তো এক চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৬)।
৩. আল্লাহর আয়াত অস্বীকারকারী
আল্লাহর নিদর্শন ও আয়াতকে অস্বীকার করা মানুষকে সত্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৯)।
৪. আখিরাত অস্বীকারকারী
দুনিয়ার জীবনই সব—এমন ধারণা পোষণ করে পরকালের জীবনকে অস্বীকার করা মানুষের জন্য চরম ক্ষতির কারণ। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছে।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩১)।
৫. নিজে ও পরিবারকে আখিরাতের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেওয়া ব্যক্তি
মানুষ শুধু নিজের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবারের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে। নিজে অন্যায়ের পথে চলা এবং পরিবারকেও আল্লাহর অবাধ্যতার পথে ঠেলে দেওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই, যারা কিয়ামতের দিন নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে ক্ষতির মধ্যে ফেলবে।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ১৫)।
৬. ঈমান, সৎকর্ম ও সত্যের পথ থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি
মানুষের জীবনের সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু দীর্ঘ জীবন পেলেই সফলতা আসে না; বরং ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমেই প্রকৃত সফলতা অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কালের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া—যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আসর, আয়াত : ১–৩)।
প্রকৃত ক্ষতি কোনটি?
কোরআনের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—দুনিয়ায় অর্থ-সম্পদ হারানোই মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়। প্রকৃত ক্ষতি হলো ঈমান হারানো, আল্লাহর অবাধ্য হওয়া, শিরকে জড়িয়ে পড়া, সত্যকে অস্বীকার করা এবং আখিরাতের সফলতা থেকে বঞ্চিত হওয়া।
অন্যদিকে, যে ব্যক্তি ঈমানের ওপর অটল থাকে, সৎকাজ করে, সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান জানায় এবং বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে—কোরআনের দৃষ্টিতে তারাই সফলতার পথে রয়েছে।
তাই জীবনের লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু দুনিয়ার মাপকাঠিতে নয়, আখিরাতের মাপকাঠিতেও করতে হবে। কারণ দুনিয়ার ক্ষতি সাময়িক, কিন্তু আখিরাতের ক্ষতি হতে পারে চিরস্থায়ী।
সময়ের আলো/এসএকে