পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের মাধ্যমে সবাই উপকৃত হয়, কিন্তু তাদের নাম কেউ জানে না। তারা জগতের কল্যাণে নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যায়। যশ-খ্যাতির মোহ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেন তারা। তাদের রেখে যাওয়া অমূল্য জিনিস থেকে দুনিয়ার মানুষ যুগ যুগ ধরে উপকৃত হতে থাকে। নিজের যত সুখ্যাতি আছে সবকিছু চুপিসারে অন্যের জন্য রেখে যায়। সে এ কল্পনা করে নিজে প্রশান্তি লাভ করে আমি যা করেছি এর খুঁটিনাটি সম্পর্কে তিনিই জানেন, যার জন্য এ কাজ করা হয়েছে। অন্যরা না জানলেও তার কোনো সমস্যা নেই।
যাদের দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ কম। দুনিয়ার জন্য তার অনেক সম্পদ নেই, কোনোমতে অল্প-স্বল্প চলার পাথেয় নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকে। যখন যা থাকে তা নিয়ে সে সন্তুষ্ট। বেজায় খুশি মনে সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা লুটিয়ে পড়ে। তারা যখন দুনিয়া থেকে চলে যায় তখন তাদের স্মরণে কোনো শোকসভার আয়োজন করা হয় না। তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় একদম সাদামাটাভাবে, যেন কেউ টেরই পায় না।
এদের কথাই হাদিসে এভাবে এসেছে- হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষণীয় হলো সেই মুমিন ব্যক্তি যার অবস্থা খুবই হালকা (স্বল্প সম্পদ এবং পরিবারের সদস্য সংখ্যাও কম) এবং যে নামাজে মনোযোগী, সুচারুরূপে তার প্রভুর ইবাদত করে, একান্ত নিভৃতেও তাঁর অনুগত থাকে, মানুষের মাঝে অখ্যাত, তার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা হয় না, আর ন্যূনতম প্রয়োজনমাফিক তার রিজিক এবং তাতেই ধৈর্যধারণকারী।
তারপর রাসুল (সা.) তাঁর দুই হাতের ইঙ্গিতে বলেন, শিগগিরই তার মৃত্যু হয়, তার জন্য ক্রন্দনকারীর সংখ্যাও কম, তার রেখে যাওয়া সম্পদও খুব সামান্য।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৭)
আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরিদ্রতা পছন্দ করতেন, দরিদ্রদের ভালোবাসতেন এবং তাদের সঙ্গে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) দোয়া করে বলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দরিদ্র অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখো, দরিদ্র থাকাবস্থায় মৃত্যু দিও এবং কেয়ামত দিবসে দরিদ্রদের দলভুক্ত করে হাশর করো।
একথা শুনে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এমন বলছেন কেন? তিনি বললেন, হে আয়েশা! তারা তো তাদের সম্পদশালীদের চেয়ে চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা! তুমি প্রার্থনাকারী দরিদ্রকে ফিরিয়ে দিও না। যদি দেওয়ার মতো কিছু তোমার কাছে না থাকে, তা হলে একটি খেজুরের টুকরা হলেও তাকে দিয়ো। হে আয়েশা! তুমি দরিদ্রদের ভালোবাসবে এবং তাদের তোমার সান্নিধ্যে রাখবে। তা হলে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তোমাকে তাঁর সান্নিধ্যে রাখবেন। (তিরমিজি , হাদিস : ২৩৫২)
আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) তো দরিদ্র ছিলেন। তবে এ দরিদ্রতায় ছিল না কোনো মুখাপেক্ষিতা। ছিল শুধু সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা। আর এই অমুখাপেক্ষিতাই ছিল তাঁর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা বড় বড় রাজা-বাদশাহরও ছিল না। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজি (সা.)-এর ওফাতের সময় তাঁর বাড়িতে মাত্র সাতটি স্বর্ণমুদ্রা ছিল।
অথচ তিনি তাও গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার অসিয়ত করে গেছেন এবং বলেছেন, ‘আমার লজ্জা হচ্ছে, ঘরে পার্থিব সম্পদ রেখে আল্লাহর রাসুল আল্লাহর সান্নিধ্যে যাবে’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৪২২২)। হে আল্লাহ! আমাদের সবাইকে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে অনুধাবন ও অনুসরণের তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/এসএকে