শিশু অপহরণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

একটি শিশুর হাসি প্রত্যেক পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার নিষ্পাপ মুখ, মায়াময় ডাক, ছোট্ট ছোট্ট দুষ্টুমি আর বাবা-মায়ের চারপাশে ঘুরে

2026-09-29T11:08:42+00:00
2026-09-29T11:08:42+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
শিশু অপহরণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একটি শিশুর হাসি প্রত্যেক পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার নিষ্পাপ মুখ, মায়াময় ডাক, ছোট্ট ছোট্ট দুষ্টুমি আর বাবা-মায়ের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো— এসব নিয়েই গড়ে ওঠে একটি পরিবারের স্বপ্ন। সেই শিশুটিকে হঠাৎ কেউ অপহরণ করে নিয়ে গেলে শুধু একটি সন্তান নিখোঁজ হয় না; মুহূর্তেই একটি পরিবারের আনন্দ পরিণত হয় আতঙ্ক, অশ্রু ও অনিশ্চয়তায়। 

শিশু অপহরণ বা কিডন্যাপিং আমাদের সমাজের অন্যতম ভয়াবহ অপরাধ। কোনো শিশুকে তার মা-বাবা ও স্বজনদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্ন করা, আটকে রাখা, মুক্তিপণ দাবি করা, পাচার করা কিংবা অন্য কোনো অপরাধে ব্যবহার করা শুধু আইনবিরোধী নয়— এটি মানবতা, নৈতিকতা ও ইসলামি আদর্শেরও চরম পরিপন্থী। শিশু একটি পরিবারের সন্তান হলেও সে সমাজের ভবিষ্যৎ। তাই শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তার মা-বাবার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র— সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

শিশু আল্লাহর দেওয়া আমানত : সন্তান আল্লাহ তায়ালার দেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত ও আমানত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)। এই আয়াত পরিবার ও সন্তানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। 

সন্তানকে শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাকে নিরাপদ রাখা, সৎ ও সুন্দর পরিবেশে বড় করে তোলা এবং বিপদ থেকে রক্ষা করাও অভিভাবকের দায়িত্ব। অন্যের সন্তানকে অপহরণ করা এই আমানতের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ অপহরণকারী একটি শিশুর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক জীবনকে ভয়াবহভাবে বিপন্ন করে।


শিশু অপহরণ মানে পরিবারকে কাঁদানো : এক শিশুকে অপহরণ করা হলে তার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারও এক ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে। সন্তান কোথায় আছে, কেমন আছে, তাকে কেউ নির্যাতন করছে কি না— এসব প্রশ্ন মা-বাবাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। একজন মায়ের কাছে সন্তান তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সন্তানের কোনো সন্ধান না পেয়ে একজন মা যে কষ্ট অনুভব করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একজন বাবা সন্তানের সন্ধানে হাসপাতাল, থানা, রাস্তা, বাজার— সম্ভাব্য সব জায়গায় ছুটে বেড়ান। পরিবারের প্রতিটি সদস্য অপেক্ষা করে কখন তাদের প্রিয় সন্তান ফিরে আসবে। অপরাধীরা যখন এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে, তখন অপরাধটি আরও নির্মম রূপ ধারণ করে।

ইসলামে জুলুমের কোনো স্থান নেই : শিশু অপহরণ মূলত জুলুমের একটি ভয়াবহ প্রকাশ। একজন নিরপরাধ শিশুর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তার নিরাপত্তাকে বিপন্ন করা স্পষ্ট জুলুম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কেননা জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে’ (সহিহ মুসলিম : ২৫৭৮)। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো; কারণ তার ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৯৬)। যে ব্যক্তি একটি অসহায় শিশুকে অপহরণ করে, সে শুধু শিশুটির ওপরই জুলুম করে না; তার পরিবারকেও সীমাহীন কষ্ট ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়।

শিশুদের প্রতি দয়া ইসলামের শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের কোলে নিতেন, আদর করতেন, সালাম দিতেন এবং তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত হাসান ইবনে আলি (রা.)-কে চুম্বন করেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকে চুম্বন করিনি।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)। অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯২০)। শিশুর প্রতি দয়া যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত, সেখানে একটি শিশুকে অপহরণ করা সেই দয়া ও মানবিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

অপহরণের ক্ষত শুধু শরীরে নয়, মনেও : শিশু অপহরণের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো এর মানসিক প্রভাব। একটি শিশু যদি ভয়, হুমকি, নির্যাতন বা দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, তা হলে তার মনে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। উদ্ধারের পরও সে অপরিচিত মানুষকে ভয় পেতে পারে, একা থাকতে আতঙ্কিত হতে পারে কিংবা স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে সময় নিতে পারে। তাই কোনো অপহৃত শিশু উদ্ধার হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। তাকে অপরাধী হিসেবে নয়, অপরাধের শিকার হিসেবে দেখতে হবে। তার প্রতি ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।


শিশু পাচার, অপরাধের আরও ভয়াবহ রূপ : শিশু অপহরণের সঙ্গে অনেক সময় পাচার চক্র জড়িত থাকে। কোনো শিশুকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে বিক্রি করা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা কিংবা বিভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার বানানো মানবতার চরম অবমাননা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৭০)। মানুষ আল্লাহর দেওয়া মর্যাদাসম্পন্ন সৃষ্টি। শিশুকে অর্থের বিনিময়ে কেনাবেচা বা শোষণের বস্তুতে পরিণত করা সেই মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা।

মুক্তিপণের জন্য অপহরণ দ্বিগুণ অপরাধ : মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে শিশুকে অপহরণ করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। এখানে একটি শিশুর জীবন ও স্বাধীনতাকে হাতিয়ার বানিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)। অতএব, অপহরণ করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা ইসলামের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না।

শিশু কোনো পণ্য নয়— সে একটি জীবন, একটি আমানত, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং জাতির ভবিষ্যৎ। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক কর্তব্য। আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি শিশু ভয় নয়, নিরাপত্তা নিয়ে বেড়ে উঠবে; কান্না নয়, হাসি নিয়ে শৈশব কাটাবে; আর প্রতিটি মা-বাবা নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন, ‘আমার সন্তান নিরাপদ।’

লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে/এমকে
  বিষয়:   শিশু  অপহরণ  মানবতা  অপরাধ 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: