মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা- দুটিই কমেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ ২০০৭ সালের পর এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে।
গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২৩ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। করোনার সময়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে অনুষ্ঠিত ২০২১ সালের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এর আগে ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। ফলে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
সোমবার সকাল ১০টায় একযোগে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফল প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট ও মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারে। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
ইংরেজি-গণিতে ধরা :
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় এবার পাসের হার কমেছে। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং গণিতে ৮২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে ইংরেজিতে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং গণিতে ৭৭ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের নিচে নেমেছে ময়মনসিংহ, বরিশাল ও সিলেট বোর্ডে। ময়মনসিংহে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ৩৩ জন অকৃতকার্য হয়েছে। বরিশালে ৬৯ দশমিক ২৪ এবং সিলেটে ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ। গণিতেও ময়মনসিংহ বোর্ডের ফল তুলনামূলক খারাপ। এ বোর্ডে গণিতে প্রতি ১০০ জনে ৩০ জন অকৃতকার্য হয়েছে।
১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাস
মাদরাসা বোর্ডেও গণিতে পাসের হার ৬৯ শতাংশের ঘরে। তবে আইসিটি, পদার্থ, রসায়ন ও উচ্চতর গণিতে তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছে। অধিকাংশ বোর্ডে আইসিটিতে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। সাতটি বোর্ডে পদার্থে এবং আটটি বোর্ডে রসায়নে পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি। উচ্চতর গণিতে সব বোর্ডেই পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে।
পাসের হারে এগিয়ে ঢাকা
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হার সবচেয়ে ঢাকা বোর্ডে- ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে-৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২ ও রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বরিশালে পাসের হার ৬০ দশমিক ৩৫, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ এবং দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।
মেয়েরা এগিয়ে
এবারও পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই সূচকেই মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
বিজ্ঞানে বেশি পাস, মানবিকে কম
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গ্রুপভিত্তিক ফলে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে বেশি- ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৮ জন।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ; উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ জন। মানবিক বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে কম- ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এ বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন।
দাখিল ও কারিগরিতে অবনতি
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমেছে। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
দাখিলে ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও কমেছে। একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনিÑ এমন মাদরাসার সংখ্যাও বেড়েছে। এবার ৯ হাজার ১৪১টি মাদরাসা থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২৬টি মাদরাসা থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। গত বছর এমন মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৮৬টি।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ভোকেশনাল পরীক্ষাতেও পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এবার পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ; গত বছর ছিল ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮১ শতাংশের বেশি।
প্রকৃত ফল
দীর্ঘদিন পরীক্ষার ফলাফল বাড়িয়ে প্রকাশের অভিযোগ থাকলেও এবার কোনো শিক্ষার্থীকে বাড়তি নম্বর বা গ্রেস মার্কস দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, এবার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় যে নম্বর পেয়েছে, সেটিই ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, এবারের ফল খারাপ হয়নি; বরং সুন্দর ফল হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, এবার খাতা পুনঃপরীক্ষা বা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। যারা পুনঃপরীক্ষণের আবেদন করবে, তাদের খাতা সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষা করা হবে। কোথাও ভুলত্রুটি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালের বোর্ডের আইনে খাতা পরিদর্শনের ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। পরীক্ষায় ভালো প্রস্তুতি থাকলেও অনেক সময় শিক্ষার্থীরা আশানুরূপ ফল করতে পারে না। পুনঃপরীক্ষণের মাধ্যমে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে।
সময়ের আলো/জেডি