এতিমের সম্পদ ও ইসলামের নির্দেশ

সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

ইসলাম

ইসলাম এতিমের অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। পবিত্র কুরআনে এতিমের সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে

2026-08-12T12:43:28+00:00
2026-08-12T12:50:38+00:00
 
  বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬,
২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
এতিমের সম্পদ ও ইসলামের নির্দেশ
সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম  আপডেট: ১২.০৮.২০২৬ ১২:৫০ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইসলাম এতিমের অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। পবিত্র কুরআনে এতিমের সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির সতর্কতা প্রদান করেছে। তাই এতিমের সম্পদের হেফাজতের দায়িত্ব পালন একজন মুমিনের জন্য আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা ও আমানতদারির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। 

এতিম সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সম্মানজনক। পবিত্র কুরআনের আয়াতে এতিমের অধিকার সংরক্ষণ, তাদের কল্যাণ সাধন এবং তাদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দাও এবং পবিত্রের পরিবর্তে অপবিত্র গ্রহণ করো না আর তাদের ধন-সম্পদ তোমাদের ধনসম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে গ্রাস করো না। নিশ্চয় তা মহাপাপ’ (সুরা নিসা : ২)। 

এই আয়াতে মহান আল্লাহ এতিমের সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে তার প্রাপ্য তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে এতিমের সম্পদে কোনো ধরনের প্রতারণা, হেরফের বা অন্যায় ভোগ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়, এতিমের সম্পদে হস্তক্ষেপ করা নয়; বরং তা বিশ্বস্ততার সঙ্গে রক্ষা করা এবং তার হক আদায় করা একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।

আল্লাহ তায়ালা আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভরছে এবং অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে’ (সুরা নিসা : ১০)। কুরআনের এই সতর্কবাণী একজন মুমিনের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বাহ্যিকভাবে কেউ হয়তো মনে করতে পারে যে, সে অর্থ-সম্পদ অর্জন করছে; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে সে নিজের জন্য জাহান্নামের আগুন সঞ্চয় করছে। এ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের জন্য আখেরাতের চিরস্থায়ী ক্ষতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।

এতিমের সম্পদ রক্ষা করার অর্থ শুধু তা অন্যের হাত থেকে নিরাপদ রাখা নয়; বরং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এমনভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা, যাতে তার কোনো ক্ষতি না হয় এবং তার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। তবে এই ব্যবস্থাপনা হবে সম্পূর্ণ তার কল্যাণের উদ্দেশ্যে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভোগ বা লাভের জন্য এতিমের সম্পদে হস্তক্ষেপ করার কোনো অবকাশ ইসলামে নেই। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা এতিমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না উত্তম পন্থা ছাড়া। যতক্ষণ না সে পরিণত বয়সে উপনীত হয়’ (সুরা আনআম : ১৫২)। একই নির্দেশ সুরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতেও এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা শিক্ষা দিয়েছেন, এতিমের সম্পদে হস্তক্ষেপ কেবল তার কল্যাণ ও সুরক্ষার উদ্দেশ্যেই হতে পারে।

কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত স্বার্থে সেই সম্পদ ব্যবহার বা আত্মসাৎ করা বৈধ নয়। এই আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা এতিমের সম্পদের কাছে যেও না সুন্দরতম পন্থা ছাড়া, যতক্ষণ না সে বয়সের পূর্ণতায় উপনীত হয়’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৪)। মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, ‘এতিমদের পরীক্ষা করো যতক্ষণ না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছে। 

অতঃপর যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্বতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদের দিয়ে দাও। আর তোমরা তাদের সম্পদ খেয়ো না অপচয় করে এবং তারা বড় হওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে’ (সুরা নিসা : ৬)। এই আয়াত ইসলামের স্বচ্ছ অর্থনৈতিক নীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে শুধু সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশই নয়; বরং যোগ্যতা যাচাই, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। একজন অভিভাবক যেন কখনো এতিমের সম্পদ নিজের সম্পদ মনে না করেন এ শিক্ষা এ আয়াতের অন্যতম তাৎপর্য।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন শুধু সম্পদ রক্ষার নির্দেশই দেয়নি; এতিমের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না’ (সুরা দুহা : ৯)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা আপনাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তাদের কল্যাণ করাই উত্তম’ (সুরা বাকারা : ২২০)। এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, ইসলাম এতিমদের প্রতি কেবল দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়নি; বরং তাদের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ নিশ্চিত করার শিক্ষা দিয়েছে। তাই তাদের সম্পদ সংরক্ষণ, সুশিক্ষার ব্যবস্থা, উত্তম চরিত্র গঠনে সহযোগিতা এবং সম্মান ও মমতার সঙ্গে লালন-পালন করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। যে কাজে এতিমের প্রকৃত কল্যাণ রয়েছে, ইসলাম সে পথই অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।

নবীজি (সা.) এতিমের প্রতি দয়া, দায়িত্বশীলতা ও তাদের অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, আমি ও এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে কাছে থাকবে। 
এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দুটি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং এ দুটির মাঝে কিঞ্চিত ফাঁক রাখলেন। এ হাদিসে এতিমের লালন-পালন, অধিকার সংরক্ষণ ও কল্যাণে আত্মনিয়োগের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। 

অন্যদিকে সহিহ হাদিসে হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের মধ্যে অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভক্ষণের কথাও উল্লেখ করেছেন। এই থেকে মুমিনের জন্য একদিকে এতিমের হক আদায়ের প্রতি উৎসাহ, অন্যদিকে তাদের সম্পদের ওপর জুলুম থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।

এতিমের সম্পদ রক্ষা করা আল্লাহ তায়ালার একটি সুস্পষ্ট বিধান এবং একজন মুমিনের আমানতদারির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। যে ব্যক্তি আল্লাহভীতির সঙ্গে এতিমের হক আদায় করবে সে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশা করতে পারে এবং আখিরাতে রাসুল (সা.)-এর শাফায়াত ও জান্নাতের সৌভাগ্যের প্রত্যাশী হতে পারে। পক্ষান্তরে অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ গ্রাসকারীদের জন্য কুরআন ও সুন্নাহে কঠিন শাস্তির সতর্কবাণী এসেছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এতিমের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের প্রতি ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যথাযথ তওফিক দান করুন।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   এতিম  সম্পদ  ইসলাম  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: