মানুষ প্রতিদিন নিজের চেহারা আয়নায় দেখে, পোশাক ঠিক করে, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেয়। কিন্তু নিজের অন্তরের দিকে কতবার তাকায়? অথচ মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তার বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে নয়; বরং তার ঈমান, নিয়ত, চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে।
পৃথিবীর জীবনে আমরা অন্যের কাছে নিজের পরিচয় গড়ে তুলি, কিন্তু আখেরাতে প্রত্যেক মানুষকে নিজের প্রকৃত পরিচয়ের মুখোমুখি হতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন চিন্তা করে দেখে, সে আগামী দিনের জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে’ (সুরা আল-হাশর : ১৮)। এই আয়াত একজন মুমিনের জীবনে আত্মপর্যালোচনার এক অনন্য নীতি প্রতিষ্ঠা করে। এখানে ‘আগামী দিন’ বলতে আখেরাতের সেই অনিবার্য সময়কে বোঝানো হয়েছে, যখন মানুষের দুনিয়ার সব পরিচয়, সম্পদ ও প্রভাবের বাইরে তার কর্মই তার সামনে উপস্থিত হবে।
আমরা সাধারণত ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করি। সন্তানের শিক্ষা, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা, চাকরি কিংবা অবসরজীবন সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি নিই। কিন্তু যে জীবনের কোনো শেষ নেই, সেই জীবনের জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নিচ্ছি এই প্রশ্নটি অনেক সময় আমাদের চিন্তার বাইরে থেকে যায়। অথচ একজন বিচক্ষণ মানুষ প্রতিদিনের জীবনকে শুধু ভোগের সময় হিসেবে দেখে না, সে প্রতিটি দিনকে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে দেখে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে’ (সুরা আর-রাদ : ১১)। এই আয়াতের শিক্ষা ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজজীবন পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা সমাজের নানা অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ করি, অন্যের দুর্নীতি, অসততা, অন্যায় ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমালোচনা করি। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা কোথা থেকে হবে? উত্তরটি আমাদের নিজেদের ভেতরেই রয়েছে।
একজন মানুষ যদি নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখে, অন্যায় থেকে ফিরে আসে, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের মানদণ্ড বানায়, তা হলে তার মধ্যেই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। এমন মানুষ যখন পরিবার গড়ে, সন্তান লালন-পালন করে এবং সমাজে দায়িত্ব পালন করে, তখন তার ব্যক্তিগত সংশোধনের প্রভাবও ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
কুরআন আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে’ (সুরা জিলজাল : ৭-৮)। এই আয়াত মানুষের জীবনে কোনো কাজই তুচ্ছ নয় এই বোধ সৃষ্টি করে। একটি ভালো কথা, কারও প্রতি সামান্য সহানুভূতি, গোপনে করা একটি নেক আমল যেমন মূল্যহীন নয়, তেমনি অবহেলায় বলা একটি কষ্টদায়ক কথা, কারও প্রতি অন্যায় কিংবা গোপনে করা কোনো পাপও হিসাবের বাইরে থাকবে না।
তাই আত্মশুদ্ধি শুধু বড় বড় আমলের বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, আচরণ ও অভ্যাসের মধ্য দিয়েই একজন মানুষের চরিত্র গড়ে ওঠে। আমাদের প্রত্যেকেরই মাঝেমধ্যে নিজের সঙ্গে নীরবে কথা বলা প্রয়োজন। আমি কেন এই কাজটি করছি? আমার নিয়ত কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য? আমি কারও প্রতি অন্যায় করেছি কি না? আমার কথা বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়েছে কি না?
আমি যে সময় পেয়েছি, তার কতটুকু কল্যাণকর কাজে ব্যয় করেছি? আমার গোপন জীবন কি আমার প্রকাশ্য জীবনের মতোই পরিচ্ছন্ন? এ ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের দুর্বলতা চিনতে সাহায্য করে। আর নিজের দুর্বলতা চিনতে পারাই সংশোধনের প্রথম দরজা।
সময়ের আলো/আআ