সারা দেশে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী তাদের দীর্ঘদিনের সাধনা ও প্রচেষ্টার কাক্সিক্ষত ফল হাতে পেয়েছে। কেউ আনন্দে আত্মহারা, আবার কেউ হয়তো আশানুরূপ ফল না পেয়ে মনের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। একটি নির্দিষ্ট সনদের জন্য মাসব্যাপী প্রস্তুতি, রাতজেগে পড়াশোনা এবং পরীক্ষা দেওয়ার এই পুরো বিষয়টি আমাদের সাময়িক জীবনের একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় মাত্র। কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শন ও শাশ্বত জ্ঞানালোক থেকে যদি আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি, তবে দেখতে পাব, আমাদের এই পুরো পার্থিব জীবনটাই মূলত একটি বিশাল ও চূড়ান্ত পরীক্ষার হল।
দুনিয়া মুমিনের পরীক্ষার ক্ষেত্র
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মানবজীবনকে একটি সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ’ (সুরা আল-মুলক, আয়াত : ২)? এই আয়াতের গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, দুনিয়া কোনো স্থায়ী আবাস বা চিরকাল ভোগ-বিলাসের জায়গা নয়, বরং এটা হলো আমল বা কর্মের ময়দান।
এখানে মানুষের জ্ঞান, মেধা, সম্পদ, সুস্বাস্থ্য, বিপদাপদ, সুখ ও দুঃখ সবকিছুই পরীক্ষার একেকটি সূক্ষ্ম মাধ্যম। এসএসসি বা যেকোনো দুনিয়াবি পরীক্ষায় যেমন প্রশ্নপত্র সহজ কিংবা কঠিন হতে পারে, তেমনি জীবনের প্রতিটি বাঁকে নানা রকম পরীক্ষা আসবে। মূল বিষয় হলো, বান্দা প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী কেমন আচরণ প্রদর্শন করছে।
পরীক্ষায় সফল হলে করণীয়
কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জনে সফল হলে বা ভালো রেজাল্ট করলে একজন মুমিনের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো বিনম্রচিত্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। মানুষের নিজস্ব মেধা, শ্রম ও চেষ্টার পেছনে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও সাহায্য না থাকলে একা সফল হওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব হতো না। অহংকার ও আত্মগরিমা ত্যাগ করতে হবে। সাফল্যের নেশায় মত্ত হয়ে নিজের মেধা বা যোগ্যতার বড়াই করা যাবে না।
ফেরাউন কিংবা কারুনের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, অহংকার মানুষের সব অর্জনকে ধ্বংস করে দেয়। দ্বিতীয়ত সদকা ও কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি করতে হবে। নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত : ৭)। সফলতার মুহূর্তে গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান-সদকা করা এবং আল্লাহর ইবাদতে আরও মনোযোগী হওয়া জরুরি।
পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে করণীয়
আর যারা কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের ভেঙে পড়া বা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলামে নিরাশ হওয়া কবিরা গুনাহ বা কুফরির সমতুল্য। মহান আল্লাহ সান্ত্বনা দিয়ে মুমিনদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুশ্চিন্তা করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ১৩৯)। এ জন্য আমাদের ধৈর্যধারণ বা সবুর করতে হবে।
ফলাফল খারাপ হলে প্রথমে ধৈর্যধারণ করতে হবে। এটা হতে পারে পরবর্তীতে আরও বড় কোনো সফলতা অর্জনের নেপথ্য প্রস্তুতি কিংবা অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ত্রুটির প্রায়শ্চিত্ত। দ্বিতীয়ত আত্মমূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় ত্রুটি ছিল, তা ঠান্ডা মাথায় খুঁজে বের করতে হবে এবং আগামী দিনের জন্য নতুন উদ্যমে কোমর বেঁধে লেগে পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার একটিমাত্র পরীক্ষাই জীবনের শেষ অধ্যায় নয়।
প্রকৃত সফলতা ও ব্যর্থতা কী
দুনিয়াবি পরীক্ষার এই ফলাফল আমাদের সাময়িক ক্যারিয়ার বা শিক্ষাজীবনের পথ নির্দেশ করতে পারে, কিন্তু এটা মানুষের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। ইসলামি পরিভাষায় প্রকৃত সফল ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি আখেরাতের বা পরকালের অনন্তকালের পরীক্ষায় সফল হতে পেরেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে বলেছেন, দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফেরের জন্য জান্নাতস্বরূপ (সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ একজন মুমিন দুনিয়ায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ, নিয়মকানুন ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে।
প্রকৃত সফলতা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘অতএব যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সে-ই সফলকাম’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ১৮৫)।
পক্ষান্তরে দুনিয়ার সব নাম-যশ, বড় ডিগ্রি, পদক ও বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েও যে ব্যক্তি আখেরাতের বিচারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে ব্যর্থ হলো, সে-ই হলো দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত বঞ্চিত ও ব্যর্থ ব্যক্তি।
মোটকথা, পরীক্ষার ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা নিয়ে অতিরিক্ত অহংকার বা ভেঙে পড়া কোনোটাই একজন মুমিনের শোভা পায় না।
এসএসসি পাসের আনন্দ যেমন ক্ষণস্থায়ী, তেমনি ফেল করার দুঃখও চিরস্থায়ী নয়। তাই আসুন, দুনিয়ার এই ছোট্ট পরীক্ষার পাশাপাশি আমাদের অনন্তকালের মূল পরীক্ষার প্রস্তুতি জোরদার করি।
সৎকর্ম, উন্নত নৈতিকতা, ইবাদত এবং মানবতার কল্যাণে নিজেদের জীবনকে পরিপূর্ণভাবে সাজিয়ে তুলি, যাতে আখেরাতের চিরন্তন ময়দানে আমরা পরম সফলতা অর্জন করতে পারি।
সময়ের আলো/আআ