তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল রিয়াদ। তুরস্কের পক্ষ থেকে মিসরকে চুক্তিতে যুক্ত করার জোরালো চেষ্টা থাকলেও সৌদি আরব এতে সম্মতি দেয়নি বলে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত আপাতত মিসরকে এই চুক্তির বাইরে রাখতে চেয়েছে সৌদি আরব। সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের ওপর রিয়াদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং মিসরকে আগের মতো কৌশলগত ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে না করার কারণেই এই অবস্থান নিয়েছে সৌদি সরকার।
গত শুক্রবার পবিত্র মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সৌদি কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চুক্তির লক্ষ্য যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা। তবে সংকটের সময় কীভাবে সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে, কোন পরিস্থিতিতে চুক্তি কার্যকর হবে এবং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী—এসব বিষয়ে চুক্তিতে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ নেই।
সৌদি সূত্রগুলো বলেছে, মিসরকে চুক্তির বাইরে রাখার পেছনে রিয়াদ ও কায়রোর মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন বড় ভূমিকা রেখেছে।
২০১৩ সালে সিসি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারকে সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তাকারী ছিল সৌদি আরব। সে সময় মিসরের দুর্বল অর্থনীতি সামাল দিতে রিয়াদ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে মিসরের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় সৌদি আরব এখন হতাশ বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
একটি সূত্র মিসরের ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ সামরিক অভিযানে ‘সীমিত ও অনির্ভরযোগ্য’ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় মিসরের অবস্থান নিয়েও রিয়াদ অসন্তুষ্ট বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মিসরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আমিরাতের সমর্থনকে সৌদি আরব নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।
সূত্রগুলো বলেছে, ইরানের হামলার সময় মিসর আবুধাবিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান পাঠালেও সৌদি আরবের জন্য একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। এ কারণে সিসি সরকারের সঙ্গে আবুধাবির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে রিয়াদের সন্দেহ আরও বেড়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার মিসরকে আঙ্কারার ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো সমাধান হলে ভবিষ্যতে কায়রো এই জোটে যোগ দিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
তুরস্কের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মিসরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে আঙ্কারা ব্যাপক চেষ্টা করেছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কায়রোর অংশগ্রহণের প্রস্তাবও দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান তিন দেশ মিলেই চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে সৌদি সূত্রগুলো দাবি করেছে, মিসর নিজে চুক্তিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়নি। বরং সৌদি আরবের আপত্তির কারণেই কায়রোকে বাইরে রাখা হয়েছে।
সৌদি রাজপরিবারের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, সিসি এই চুক্তিতে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন। তবে রিয়াদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তাঁর আনুগত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
সৌদি সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিসরের রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি দেশটির সামরিক সক্ষমতাও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।
তাদের মতে, তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী ও শক্তিশালী অস্ত্র উৎপাদন খাত এই জোটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিপরীতে মিসরের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ বেসামরিক পণ্য উৎপাদনে কেন্দ্রীভূত এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দেশটি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো অবদান রাখতে পারবে না।
মিসরের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি ও কার্যকারিতা নিয়েও সৌদি সূত্রগুলো প্রশ্ন তুলেছে।
মিসরকে আপাতত বাইরে রাখা হলেও ভবিষ্যতে দেশটির জন্য এই প্রতিরক্ষা চুক্তির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
সৌদি সূত্রগুলোর ভাষ্য, কায়রোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হলে ভবিষ্যতে মিসরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে বর্তমানে সৌদি আরবের অবস্থান হলো— মিসরকে জোটের বাইরে রেখেই নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এগিয়ে নেওয়া।
সময়ের আলো/কেএইচ