মতিউর রহমান চৌধুরী। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের দীর্ঘ অভিজ্ঞ ও বহুল পরিচিত এক নাম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশের সংবাদমাধ্যমের নানা উত্থান-পতন, রাজনৈতিক পালাবদল এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাক্ষী হয়ে সাংবাদিকতা করে আসছেন। ২০২৬ সালে তিনি নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গণমাধ্যম, রাষ্ট্র-রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে-
সময়ের আলো : গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অন্তরায় হিসেবে আপনি কী মনে করেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি। নানা ধরনের আইনকানুন। সাংবাদিকদের হঠকারিতা, রাজনৈতিকভাবে বিভক্তি। রাজনীতিকদের অসহিষ্ণুতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একচেটিয়া প্রভাব। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে কখনো আসেনি। স্বাধীনতার পর কিছুটা এসেছিল, তাও স্বল্প দিন। ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ লিখে প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন বিখ্যাত হয়েছিলেন। কিন্তু বিপদের মাত্রাও বেড়েছিল।
তৎকালীন সরকার নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৯৭৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইন চালু হয়। যে আইনবলে পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রশাসনের হাতে। মাত্রাতিরিক্ত হঠকারিতা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হরণ করে অনেক সময়। যেমন, বেগম মুজিব ঘুষ খান- এই খবর ছাপা হওয়ার পর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়।
জাসদের হঠকারিতাও ছিল। আমি নিজেও চাকরি হারিয়েছি। আরও অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। কথায় কথায় চাকরি যেত। চারটা পত্রিকা রেখে বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় সেনাশাসন থাকার কারণে মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশই তৈরি হয়নি কখনো।
স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতার পরে গণমাধ্যমে কতটুকু পরিবর্তন এসেছে?
স্বাধীনতার আগে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সাংবাদিকরা ছিলেন ঐক্যবদ্ধ। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। সাংবাদিক ইউনিয়ন ছিল সক্রিয়। দলীয় রাজনীতি তাদের কখনো গ্রাস করেনি। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আব্দুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী, এবিএম মুসাসহ বরেণ্য সাংবাদিকরা এক মঞ্চে থেকে লড়াই করেছেন, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠে।
বঙ্গবন্ধুর জমানায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ফয়েজ আহমদ লিখেছিলেন- সত্যবাবু মারা গেছেন। তখনকার পরিস্থিতি কেমন ছিল এই কটি শব্দের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, তখন সাংবাদিকরা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলেন। বেশ কয়েকজন জেলেও যান। আর এখন সম্পূর্ণ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।
ইউনিয়নগুলো মৃতপ্রায়। দলীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে গণমাধ্যম। ফলে সঠিক সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শাসকরা বরাবরই সুযোগ খোঁজেন। সমালোচনা তাদের কাছে অসহ্য। যতবারই নিয়ন্ত্রণ এসেছে ততবারই সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি দলীয় বিবেচনায় প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের একটা ইতিহাস আছে।
শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এরশাদের জমানায় সব পত্রিকা বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানানোর ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। রাজনৈতিক অস্থিরতা বারবারই গণমাধ্যমকে কাবু করেছে। অনেক নিবর্তনমূলক আইন দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এখানে জোরালো প্রতিবাদ হয়নি। ফ্যাসিবাদী শাসনকালে সাংবাদিকতা ছিল দলীয় কাঠামোর মধ্যে।
রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে পতিত স্বৈরাচার সুযোগ নেয়। পালাবদলের ঘটনার সূত্রপাত তখন থেকেই। এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনের যে ধারাটি সাংবাদিকতার শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, তার অবসান ঘটে প্রয়াত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের এক আদেশে।
আমার লেখা ‘দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য’ মন্তব্য প্রতিবেদনের কারণে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। বিষয়টি গড়ায় আদালতে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন তার ঐতিহাসিক রায়ে কথায় কথায় সংবাদপত্র বন্ধ করার ধারাটি খারিজ করে দেন। আজ আমরা যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছি তার ওই আদেশের বদৌলতে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গণমাধ্যম কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছে বলে মনে করেন?
বিগত সরকারের সময় স্বাধীনতা ছিল সীমিত। সাংবাদিকদের অনৈক্য এবং দলবাজির কারণে স্বাধীনতার বাকি অংশটুকুও শাসকদের হাতে চলে যায়। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সাংবাদিকদের বিভক্তি ছিল এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
গণমাধ্যম কমিশনের সুপারিশ যথাযথ বাস্তবায়ন করলেই কি সব পক্ষ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে?
আমার তা মনে হয় না। আইন দিয়ে কাউকে দায়িত্বশীল করা যায় না। মুক্তচিন্তার পরিবেশ না থাকলে সাংবাদিকদের হাত বাঁধা পড়বেই। কথা বলার স্বাধীনতা সংকুচিত হবে- এটাই স্বাভাবিক। কালাকানুন বাতিল করাটা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন একটা মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। আপনি বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন। অনেক সময় তারা ব্রেকিং নিউজও দিচ্ছে।
প্রিন্ট মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কেমন মনে করেন, বিশেষ করে যেখানে মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইনের প্রতি পাঠক, দর্শক দৃষ্টি আকর্ষণ করে তুলছে, তাতে কি প্রিন্ট মিডিয়া হুমকির মধ্যে পড়বে, নাকি তার বৈশিষ্ট্যের জায়গাটা আরও বৃদ্ধি পাবে?
প্রিন্ট মিডিয়া প্রচণ্ড চাপে। বিশ্বব্যাপী প্রিন্ট মিডিয়ার বিকাশ অনেকটাই থেমে গেছে। তারপরও মানুষজন প্রিন্ট মিডিয়া কী বলছে, তার ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে প্রিন্ট মিডিয়া এখনও এগিয়ে। শত চাপের মধ্যেও এটি টিকে থাকবে। তবে সনাতনী কায়দায় প্রিন্ট মিডিয়া বের করলে আখেরে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।
প্রিন্ট মিডিয়া আর্থিক সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়ছে। আর্থিক খাতগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে সংবাদমাধ্যমের ওপর। শুধু সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে প্রিন্ট মিডিয়া টিকে থাকতে পারে না। আর মাল্টিমিডিয়ার কথা তো জানেনই। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মাল্টিমিডিয়া পৌঁছাচ্ছে না। মাল্টিমিডিয়াও থাকবে, প্রিন্ট মিডিয়াও থাকবে। তবে অন্য কোনো ফর্মে।
আপনি তো একসময় ভয়েস অব আমেরিকায় কাজ করেছেন। রেডিও গণমাধ্যম বিশ্বের অন্যতম ছিল, এখন বন্ধ, বিবিসি রেডিও বন্ধ। রেডিও সাংবাদিকতা কি হারিয়ে গেল?
রেডিও সাংবাদিকতা ঝুঁকির মধ্যে। বিশ্বব্যাপী শত শত রেডিও বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে ডিজিটাল মাধ্যমের হাতেই চলে গেছে রেডিও সাংবাদিকতা। আমি ২৮ বছর ভয়েস অব আমেরিকায় কাজ করেছি। কিন্তু হঠাৎ করেই ট্রাম্প প্রশাসন তিনটি ভাষা ছাড়া বাকি ৪৩টি রেডিও নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়। এ নিয়ে আইনি লড়াই চলছে।
বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এক স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল। ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসির আওয়াজ। ডিজিটাল যুগে নতুন করে সবকিছু সাজাতে হচ্ছে। একের পর এক চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে। রেডিও সাংবাদিকতা হয়ে পড়েছে কিছুটা হলেও সংকুচিত।
বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিকের যতটুকু স্বাধীনতা তা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় কতটা সহায়ক বলে মনে করেন?
আমি মনে করি বেসরকারি টেলিভিশনের ভূমিকা বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগে যা বলা যেত না, এখন সীমিত পরিসরে হলেও বলা যাচ্ছে। দলীয় রাজনীতি না থাকলে, সেলফ সেন্সরশিপ না থাকলে পরিস্থিতি পাল্টে যেত বলেই আমার বিশ্বাস। পালাবদলের ঘটনায় টিভি সাংবাদিকরা অস্থির।
কেউ কেউ ফেসবুক দেখে বাড়ি থেকে বের হন। জানার চেষ্টা করেন- তার চাকরি আছে কি না। এই পরিস্থিতি সরকার নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকরাই তৈরি করেছেন।
সময়ের আলো/কেএইচও