চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)-এর পুকুরে ডুবে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে চুয়েট মেডিকেল সেন্টারের সক্ষমতা বাড়ানো, পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স সংযোজন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফায়ার ব্রিগেডের ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসের সব পুকুরে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।
শুধু দুর্ঘটনার পর সাময়িক ব্যবস্থা নয়, ক্যাম্পাসের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। উপাচার্যের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে পুকুরের গভীরতা নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার সরঞ্জাম ও লাইফ বয়া স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং পুকুরের পাশে সার্বক্ষণিক আনসার সদস্য মোতায়েনের মতো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি চুয়েটের পুকুরে ডুবে অর্ণব সাহা, চমক দত্ত ও শান্ত দেব নামে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। পরপর এমন ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই ২৪ আবর্তের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উপাচার্যের কাছে এসব দাবি জানানো হয়। দাবির তালিকার শুরুতেই রয়েছে চুয়েট মেডিকেল সেন্টারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স সংযোজনের দাবিও করা হয়েছে। প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল সেন্টারে সবসময় অ্যান্টিভেনম মজুত রাখার দাবি রয়েছে। ক্যাম্পাসে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি ফায়ার ব্রিগেডের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, বড় ধরনের দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার ও প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসের নিজস্ব জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর পুকুরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দাবিতে। সব পুকুরে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, লাইফ বয়া, উদ্ধার সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। পুকুরের পাশে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য একজন আনসার সদস্য নিয়োগেরও দাবি রয়েছে। এতে কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
কাজী নজরুল ইসলাম হল এবং শিক্ষকদের ডরমিটরির পুকুরের গভীরতা পাঁচ ফুটের মধ্যে এনে সুইমিং পুলের আদলে করার চলমান কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের অন্যান্য পুকুরের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। পুকুরের নকশা ও নির্মাণকাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) মাধ্যমে পুকুরগুলোর নকশা ও নির্মাণকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রয়োজন হলে তদন্তের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ ও সংশোধনী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ১১ দফা দাবিতে ক্যাম্পাসের ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক দ্রুত সংস্কারের বিষয়টিও রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সব নির্মাণ ও সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজ চলতে থাকায় শিক্ষার্থীদের চলাচল ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অর্ণব সাহা, চমক দত্ত ও শান্ত দেবের মৃত্যু শুধু তিনটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তাই দুর্ঘটনার পর সাময়িক ব্যবস্থা নয়, ক্যাম্পাসের চিকিৎসা, উদ্ধার ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তায় স্থায়ী পরিবর্তন আনার এখনই সময়।
২৪ আবর্তের শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কাছে দেওয়া আবেদনে দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সময়ের আলো/জোই