ভাঙা সেতুতে বিচ্ছিন্ন ধোপাছড়ী, বর্ষায় বাড়ে দুর্ভোগ

এম হেলাল উদ্দিন নীরব, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

সারাদেশ

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ধোপাছড়ী ইউনিয়ন। ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায়

2026-09-28T10:11:12+00:00
2026-09-28T10:11:12+00:00
 
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
ভাঙা সেতুতে বিচ্ছিন্ন ধোপাছড়ী, বর্ষায় বাড়ে দুর্ভোগ
এম হেলাল উদ্দিন নীরব, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:১১ এএম 
ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর স্থায়ী সেতু। ছবি : সময়ের আলো
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ধোপাছড়ী ইউনিয়ন। ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয়রা। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যানের উদ্যোগে নির্মিত কাঠের সেতুটিও সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মাঝের দুটি খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী সেতুর প্রতিশ্রুতি মিললেও এর বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ তারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আয়তনে চন্দনাইশ উপজেলার অন্যতম বড় ইউনিয়ন ধোপাছড়ীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে বনভূমি ও ফরেস্ট্রি রিজার্ভ। সেগুন, গর্জন, গামারি ও বিভিন্ন মূল্যবান বৃক্ষে সমৃদ্ধ এ পাহাড়ি অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক থেকে এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতার সময়ও ধোপাছড়ী গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা ছিল। তখন এটি ঐতিহাসিক দোহাজারী ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৭২ সালে ধোপাছড়ী পৃথক ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় সমস্যা ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর স্থায়ী সেতুর অভাব। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়াটি ইউনিয়নের মাঝ বরাবর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশেছে। ফলে এটি ইউনিয়নের একটি বড় অংশকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে।


ছড়ার পূর্ব পাশে রয়েছে ইউনিয়নের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড এবং বান্দরবান জেলার একটি অংশ। পশ্চিম পাশে রয়েছে ধোপাছড়ী বাজার, ধোপাছড়ী শীলঘাটা উচ্চ বিদ্যালয়, পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রসহ ১, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা।

শুষ্ক মৌসুমে কোনোভাবে ছড়া পার হওয়া গেলেও বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঢল ও প্রবল স্রোতে পানি বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও সাধারণ পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় পানি বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতও বন্ধ হয়ে যায়।

কৃষিপণ্য পরিবহণেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় স্থানীয় কৃষকদের। ধোপাছড়ী এলাকায় পাহাড়ি জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করেন অনেক কৃষক। তবে উৎপাদনের পর সেগুলো বাজারে পৌঁছাতে বাড়তি পরিবহন ব্যয় গুনতে হয়। এতে উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে কৃষকদের অভিযোগ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুর সংকট শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন, স্থানীয় বাজারব্যবস্থা ও এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত।

দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার চৌধুরী প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করে দেন বলে স্থানীয়রা জানান। অস্থায়ী ওই সেতু চালু হওয়ার পর মানুষের চলাচল কিছুটা সহজ হয়। বিশেষ করে রোগী পারাপার ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে কাঠের সেতুটির স্থায়িত্ব নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মাঝের দুটি খুঁটি ভেঙে যায়। ফলে বর্তমানে সেতুটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য ওসমান চৌধুরী বলেন, ‘কিছুদিন আগে পাহাড়ে অতিবৃষ্টির ফলে প্রবল পাহাড়ি ঢল নামে। সেই ঢলের স্রোতে সেতুর মাঝখানের দুটি খুঁটি ভেঙে ভেসে যায়। ফলে বর্তমানে সেতুটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীরা ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচনের সময় বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি তাদের। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্যের কাছে স্থানীয়দের অন্যতম দাবি ছিল এ ছড়ার ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণ।

দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রতিশ্রুতির পরও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় হতাশ স্থানীয়রা। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ জসিম উদ্দিন আহমদের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের মতে, ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর টেকসই সেতু নির্মাণ করা হলে বর্ষায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি জরুরি রোগী পরিবহন, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং ইউনিয়ন পরিষদ ও প্রশাসনিক সেবা গ্রহণে মানুষের ভোগান্তি কমবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, ধোপাছড়ী ছড়ার ওপর এখন একটি টেকসই ও স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক। তাদের ভাষায়, প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে অনেক বছর কেটে গেছে। এখন তারা আশ্বাস নয়, এর বাস্তবায়ন চান।

এ বিষয়ে চন্দনাইশ উপজেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে আমি নিজেই সেতুটির বর্তমান অবস্থা দেখেছি এবং সেখানে গিয়ে ঝুঁকিরও সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু সেতুটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে এবং বান্দরবান সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত, তাই এর স্থায়ী সমাধান কিংবা একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ সড়ক ও জনপথ বিভাগকেই নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমাদের সীমিত প্রকল্প ও বরাদ্দের মধ্য থেকে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু সংস্কার ও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ উপজেলা উন্নয়ন বাজেট থেকেও সাধ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করার কথা জানান তিনি।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   ভাঙা সেতুতে বিচ্ছিন্ন ধোপাছড়ী  বর্ষায় বাড়ে দুর্ভোগ 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: