বিএনপির রাজনীতিতে এক উদীয়মান ও প্রগতিশীল মুখ ইয়াসের খান চৌধুরী। বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গণমাধ্যমের নানা দিক ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি সময়ের আলোর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক সাব্বির আহমেদ।
সময়ের আলো : আপনার দলের প্রতিষ্ঠাতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দিয়েছেন, কথাটা সঠিক; কিন্তু তার দল সরকারে এসে এর চর্চা করতে পারে না কেন?
ইয়াসের খান চৌধুরী : গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস রাখা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রাখা যেকোনো দায়িত্বশীল সরকারের জন্যই একটি চর্চার বিষয়। নীতিগতভাবে আমাদের দল গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার তথা বিএনপির সব সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চর্চা করে।
গণমাধ্যম স্বাধীন থাকবে, কাজ করবে- এটি শুধু মুখে বলা নাকি বাস্তব প্রতিফলন জরুরি?
নিশ্চয়ই মুখের কথা নয়, বাস্তব প্রতিফলনই আসল।
একটি টেলিভিশন চ্যানেল একজন প্রতিমন্ত্রীর নিউজ করেছে, সেটি উধাও হয়ে গেল, ওই চ্যানেল অভিযোগ করেছে, তার কী জবাব?
কোনো প্রতিমন্ত্রীর সংবাদের কারণে চ্যানেল থেকে খবর উধাও হয়ে যাওয়া বা কোনো সংবাদ মাধ্যমকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ যদি থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমান সরকার কোনো ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করতে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা সমর্থন করে না।
গণমাধ্যম সংস্কার আসলে কোন বিষয়টিতে জরুরি?
সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত সুরক্ষা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার মান বাড়ানো, প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপতথ্য বা অসত্য তথ্য ছড়ানো বন্ধ করা, গণমাধ্যমকে দলীয় প্রভাবের বাইরে রেখে একটি স্বাধীন তদারকি কাঠামোর অধীনে আনা। এসবই আমার কাছে জরুরি বলে মনে হয়।
আইসিটি আইনে সাংবাদিকদের ঘন ঘন মামলার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তার প্রতিকার?
আইসিটি বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার রোধে সরকার কাজ করছে। অহেতুক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো সাংবাদিককে যাতে আইনি জটিলতায় বা দ্রুত গ্রেফতার করে না ফেলা হয়, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ‘বিশেষ স্ক্রিনিং ও প্রাক-তদন্ত’ ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইসিটি আইনে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এখনও মামলা করা হয়নি।
বর্তমান সরকারের অধীনে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয় কী কী নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে?
বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের অন্যতম অঙ্গ হিসেবে গণ্য করে। গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে বজায় থাকে সে জন্য সরকার কাজ করছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন পুনর্গঠন, গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে কাজ চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশে অনেক সময় আইনি বাধার সম্মুখীন হতে হয়, এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান কী?
এখন পর্যন্ত সরকার কোনো সংবাদ প্রত্যাহার করতে গণমাধ্যমকে চাপ দেয়নি বা মিডিয়া কন্ট্রোল করেনি। এটি বলতে পারেন সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। অতীতে ফ্যাসিস্ট আমলে আমরা দেখেছি, সরকারের বা সরকারি লোকের বিপক্ষে গেলে সেসব সংবাদ বিভিন্ন চাপ দিয়ে প্রত্যাহার করা হতো। আমরা মনে করি দুর্নীতি দমনে সাংবাদিকরাই সরকারের বড় সহযোগী।
তথ্য অধিকার আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়নে এবং সরকারি দফতরগুলো থেকে তথ্যপ্রাপ্তি আরও সহজ করার বিষয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
তথ্য দিতে যাতে অহেতুক বিলম্ব না হয়, সে জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সক্রিয় করা হয়েছে। এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় কি না সে বিষযে চিন্তাভাবনা চলছে। সরকারি কাজের স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রতিটি দফতর বাধ্যতামূলকভাবে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও অর্থ সংক্রান্ত তথ্য নিজ নিজ ওয়েবসাইটে হালনাগাদ রাখছে। ফলে সাংবাদিকরা বা সাধারণ জনগণ যে কেউ ইচ্ছে করলে ওয়েবসাইট সার্চ করেই তথ্য পেতে পারেন। এ ছাড়া সাংবাদিকদের কাজ সহজ করতে আরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন পোর্টালে প্রতিনিয়ত গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো রোধে তথ্য মন্ত্রণালয় কী ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা পরিচালনা করছে?
সরকারিভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) বাংলা ফ্যাক্ট নামে একটি ফ্যাক্টচেক ব্যবস্থা চালু করেছে। এ ছাড়া বেশ কিছু বেসরকারি ফ্যাক্টচেক চালু হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে চিন্তার বিষয় হচ্ছে এআইয়ের অপব্যবহার। বিকৃত ছবি, ভিডিও, অপতথ্য, অসত্য তথ্য এআই ব্যবহার করে ছড়ানো হচ্ছে, সাধারণ মানুষ না জেনে তা শেয়ার করছে। গণমাধ্যমগুলো এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারে। যাচাই-বাছাই না করে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য যেন গণমাধ্যম ব্যবহার না করে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। তাতে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে।
মূলধারার গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে জবাবদিহি ও ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কোনো নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে কি?
সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ‘ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রেমওয়ার্ক’ নিয়ে আলোচনা চলছে। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো সেন্সরশিপ গঠন করা নয়; বরং দায়িত্বশীল ও রুচিশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখা।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের আধুনিকায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে এদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের আধুনিকায়নে সব প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঐতিহ্যবাহী এই দুটি প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিটিভি এবং বেতারের মানসম্মত নাটক, অনুষ্ঠান, ডকুমেন্টারি ও খবর প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে মানুষ আগ্রহ নিয়ে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান দেখে। আমরা ইতিমধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের ফরেনসিক অডিটের ব্যবস্থা করেছি, যাতে বিগত সময়ে লুটপাটের সঠিক চিত্র আমরা জনগণকে জানাতে পারি।
আপনারা জানেন, বিটিভিতে গত বিশ্বকাপে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে খেলা দেখানো হয়েছিল। এটি ছিল লুটপাটের প্রজেক্ট। কিন্তু বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ায় বিনা টাকায় আমরা এবার বিশ্বকাপ ফুটবল দেখাতে সক্ষম হয়েছি। স্বৈরাচার সরকার আর জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকারের পার্থক্য এখানেই। আপনাদের দায়িত্ব এসব কথা জনগণের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া।
জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিবন্ধিত নিউজ পোর্টালগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
নিবন্ধিত নিউজ পোর্টালগুলোর সঠিক মান ধরে রাখতে ‘প্রেস কাউন্সিল’কে আধুনিকায়ন করার চিন্তা চলছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে এ বিষয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অপসাংবাদিকতা রোধে প্রকৃত সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরি করা এবং ওয়েজবোর্ড বা উপযুক্ত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে গণমাধ্যেমকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিশ্বব্যাপী প্রসার এবং দেশীয় সিনেমা হলগুলোকে আধুনিকায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে?
ইতিমধ্যে এফডিসিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এফডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ শুরু হয়েছে। এফডিসি এবং কবিরপুরে ফিল্ম সিটির সংস্কার ও নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। ফলে চলচ্চিত্র অঙ্গনে পুরোদমে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। সিনেমা হল সংস্কার, নতুন করে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ ও আধুনিক স্ক্রিন বসাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাধীনতার আগের ও পরের গণমাধ্যমের ভূমিকার মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?
স্বাধীনতার আগে গণমাধ্যম ছিল জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রধান অস্ত্র। আর স্বাধীনতার পর গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের পরিসর বেড়েছে, তবে ডিজিটাল যুগে গুণগত মানের কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যা অতিক্রম করাই এখন আমাদের লক্ষ্য।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি পত্রিকা বা টেলিভিশন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যেতে না পারার দুর্বলতা কোথায়?
বাংলাদেশের একটি পত্রিকা বা টেলিভিশন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে না পারার দুর্বলতা হলো- ভাষাগত সীমা ও গ্লোবাল কনটেন্ট তৈরিতে পিছিয়ে থাকা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভাষায় (ইংরেজি) কনটেন্ট কম করা এবং বৈশ্বিক দর্শকদের উপযোগী বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনার অভাব। বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও গভীর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের বড় বার্তা সংস্থা তৈরির জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকা একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করছে- এ উদ্যোগকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকা গণমাধ্যম বিষয়ে যে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত সময়োপযোগী, প্রশংসনীয় এবং ব্যতিক্রমী। সাধারণত গণমাধ্যমগুলো অন্যান্য খাত নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করলেও নিজ শিল্প বা ‘গণমাধ্যম’ উদ্যোগ কমই দেখা যায়। এটি আত্মপর্যালোচনা এবং গণমাধ্যমের সংকট ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করার চমৎকার একটি প্ল্যাটফর্ম। আপনার পত্রিকা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকপ্রিয়তা ধরে রাখুক- এই শুভ কামনা রইল।
আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাকে এবং সময়ের আলোর সব পাঠককেও ধন্যবাদ।
সময়ের আলো/এসএকে