চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে’ বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার তিন দিন পার হলেও, এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে, অন্যদিকে মামলার আইনি জটিলতা ও আর্থিক সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটি তদন্তে শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ওই জাহাজে হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও অ্যামোনিয়ার মতো মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিমের প্রধান অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেঞ্জামিন রিয়াজী জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
মামলা না হওয়া সম্পর্কে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিউল ইসলাম জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ বা এজাহার নিয়ে আসেননি। তবে আইন অনুযায়ী যদি কোনো পরিবার মামলা না করে, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করবে বলে তিনি জানান।
তৃণমূল পর্যায়ের তথ্য ও শ্রমিক নেতাদের মতে, মামলা না করার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো মালিকপক্ষের আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি। আইন অনুযায়ী একটি দুর্ঘটনায় মৃত শ্রমিকের পরিবার সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে ২-৩ লাখেও নেমে আসে। তবে, মালিকরা এখন পরিবারপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায়, অনেক পরিবার আইনি লড়াই বা পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছে না।
শ্রমিক নেতারা এই ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত বলেন, ‘বড় ঘটনাগুলো এভাবে আড়ালে পড়ে যাওয়ার কারণেই দুর্ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।’
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, যে জাহাজকে ‘গ্যাস ফ্রি’ সনদ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে বিষাক্ত গ্যাস কীভাবে পাওয়া গেল? তারা এই সনদের বৈধতা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানান।
বাংলাদেশ শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মো. মহসিন জানান, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। তাদের মূল অগ্রাধিকার এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং মৃতদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
মৃত শ্রমিক সানি জলদাসের বড় ভাই চন্দন জলদাসসহ স্বজনদের দাবি, জাহাজটি সঠিকভাবে গ্যাসমুক্ত করে কাজ শুরু করলে হয়ত তাদের প্রিয়জনদের অকালে প্রাণ দিতে হতো না।
বর্তমানে ফেরদৌস স্টিল কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে ইয়ার্ডটি নিয়ে ভীতি বিরাজ করছে।
সময়ের আলো/মহু