অটোরিকশার আড়ালে রাজনীতি, কালো টাকা

শাহনেওয়াজ

জাতীয়

নজরুল ইসলাম। দেশের বাড়ি বগুড়া। তিনি সচিবালয়ের এক কর্মচারীর মালিকানাধীন অটোরিকশা চালান। হাবিব মোল্লা নামে সেই কর্মচারীর ২৫টি অটোরিকশা রয়েছে।

2026-08-19T00:23:56+00:00
2026-08-19T00:23:56+00:00
 
  বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
অটোরিকশার আড়ালে রাজনীতি, কালো টাকা
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
নজরুল ইসলাম। দেশের বাড়ি বগুড়া। তিনি সচিবালয়ের এক কর্মচারীর মালিকানাধীন অটোরিকশা চালান। হাবিব মোল্লা নামে সেই কর্মচারীর ২৫টি অটোরিকশা রয়েছে। নজরুল ঢাকায় এসেছেন মূলত গা-ঢাকা দিতে। একসময় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পাতি নেতা ছিলেন। নিজের পরিচয়কে আড়াল করতে অটোরিকশা চালানোর সময় মুখে মাস্ক পরেন। কখনো পরেন ক্যাপ।

ঢাকার অলিগলিতে তাই এখন শুধু জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালানো মানুষের গল্প নেই; এর আড়ালে তৈরি হয়েছে রাজনীতি, কালো টাকা ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ অটোচালক হিসাবে হাজির হন। 

অন্যদিকে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক নেতাদের কেউ কেউ বিনিয়োগ করেছেন এই ব্যবসায়। বাদ যাননি সরকারি চাকরিজীবীরাও। কোথাও শত শত অটোরিকশার মালিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, কোথাও আবার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে চলছে ব্যাটারি চার্জ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গ্যারেজ, চালক ও মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে অটোরিকশাকেন্দ্রিক এক অদৃশ্য অর্থনীতির চাঞ্চল্যকর চিত্র ওঠে এসেছে।

নজরুলের মতোই কামরাঙ্গীরচরের আরেক অটোচালক জাকির। বাড়ি বরগুনায়। তিনিও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। গণঅভ্যুত্থানে দলের পতনের পর কিছু দিন গা ঢাকা দেন। কিছু দিন গাজীপুরে ছিলেন। শেষমেশ কামরাঙ্গীরচরে এসে অটোরিকশা চালাতে শুরু করেন। এভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাকর্মী বসত গড়েন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। তাদের অনেকেই এখন অটোরিকশা চালক। কামরাঙ্গীরচরে প্রায় ২৫০টি গ্যারেজ রয়েছে। এসব গ্যারেজের বেশিরভাগ অটোরিকশাচালক নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। 

নাম না প্রকাশ করার শর্তে বেশ কয়েকজন অটোরিকশাচালক স্বীকার করেছেন, মূলত গ্রামে নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান নিয়েছেন তারা। কাজের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই অটোরিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ঢাকা শহরে কোথায় কোথায় তারা অবস্থান নিয়েছেন- এ ব্যাপারে সহজে কেউ মুখ না খুললেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহরের প্রায় সব এলাকায় তারা ছড়িয়ে আছেন। 

সুরুত আলী নামে একজন অটোরিকশাচালক অকপটে স্বীকার করেন, এখন তাদের পাশে কোনো নেতা নেই। তাই বাধ্য হয়ে মাথায় ক্যাপ পড়ে অটোরিকশা চালাতে হয়। তার নামে মামলা আছে বলেই তিনি রাতে গ্যারেজে ঘুমান। বেশিরভাগ সময়ে মুখে মাস্ক পরে থাকেন। 

লালবাগের আমলিগোলার একটি গ্যারেজের মালিক আয়াত হোসেন। তিনি বলেন, আমার এলাকায় অনেক অটোচালক ঢাকার বাইরের। অনেকের নামে মামলা আছে। মামলা এড়াতে তারা এখন ঢাকায়। জীবন-জীবিকার স্বার্থে অটো চালান।
মুগদা-মান্ডা এলাকায় যারা অটো চালান তাদেরও বেশিরভাগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। তবে ভয়ে নীরবে অটো চালিয়ে যাচ্ছেন পেটের দায়ে। এমনি এক অটোচালক নূর মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কী করব এখন। আগে দেশে দোকান ছিল। ভালোই চলছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতনের পর গা ঢাকা দিতে হলো। একসময় ঢাকা চলে এলাম। এখানে তো কেউ সহজে চিনবে না।’

বসিলার এক অটোচালক বাদল বলেন, বসিলার এমন কোনো স্থান নেই যেখানে পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী নেই। যারা এখন অটো চালায়। 

খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার গ্যারেজ মালিক হাবিব মোল্লা বলেন, ‘আমার যে কয়টি অটো আছে তার বেশিরভাগ চালক পোড় খাওয়া। অর্থাৎ তারা ঢাকার বাইরে থেকে আসা। এখন অবশ্য অনেকে দেশের বাড়িতে যাওয়া-আসা করে। তবে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ গ্যারেজে যারা অটোচালায় তারা বাসা ভাড়া না নিয়ে রাতে গ্যারেজে ঘুমায়।’

অটোতে শুধু রাজনীতি না, পড়েছে কালো টাকার থাবাও :  

একসময় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের এলাকাভত্তিক পাতি নেতা ছিলেন। বিভিন্নভাবে দুই হাতে টাকা কামিয়েছেন। এসব টাকা অটোতে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে বিনিয়োগ করেছেন। কেউ সরাসরি অটো কিনে মহল্লায় নামিয়ে দিয়েছেন। আবার কেউ সুদে কিস্তিতে অনেককে ঋণ দিয়েছেন। যারা নিজেরা অটো কিনে মালিক হয়েছেন, অটোতে বিনিয়োগ করেছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের এমন সাবেক একজন নেতা বলেছেন, ‘টাকা আর কোথায় রাখা যায়। ব্যাংকে রাখলে সমস্যা হতে পারে। এর চেয়ে ভালো অটোতে বিনিয়োগ করা।’ অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন, এখন তিনি সরাসরি যোগাযোগ না রেখে তার আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন। বর্তমানে তিনি কেরানীগঞ্জে বসবাস করেন। 

মালিবাগ চৌধুরী পাড়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনটির এক নেতা বলেন, ‘সংসার চালাতে হলে কিছু তো একটা করতে হবে। তাই কয়েকটি অটো নামিয়েছি। প্রতিদিন অটোপ্রতি ৭০০ টাকা পাচ্ছি।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘ঢাকা শহরে আমাদের মতো এমন ছোট ছোট নেতা রয়েছেন তারা এই অটোর ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কারণ এটা অত্যন্ত নিরাপদ। কোনো ধরনের ঝুট-ঝামেলা নেই। দিন শেষে টাকা গুনছি। গ্যারেজ আর চার্জিংয়ের জন্য অবশ্য প্রতিদিন অটোপ্রতি ১২০ টাকা দিতে হয় গ্যারেজ মালিককে।’ 

অটো ব্যবসায় সরকারি কর্মকর্তাদের পোয়াবারো : 

বাসাবোর কদমতলায় সিআইডির একজন ইনস্পেক্টর থাকেন। তার ২০০টি অটোরিকশা রয়েছে। প্রতিটির দাম ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পান্থপথ এলাকার বাসিন্দা সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তারও ২৫টি অটোরিকশা রয়েছে। যার প্রতিটির দাম ১ লাখ টাকার বেশি।

একজন প্রভাবশালীর রাজনৈতিক নেতার গাড়ি চালাতেন আবদুল কাদের নামে একজন। ৫ আগস্টের পর সেই নেতা পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর চাকরি করেননি। এখন দিব্যি অটো চালান। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন আমি প্রতিদিন নগদ টাকা পাই। আর চাকরি করলে মাস শেষে বেতন পাব। এর চেয়ে প্রতিদিন নগদ টাকা পাওয়াই ভালো। আর প্রতিদিন জমা দিয়ে পাচ্ছি ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা।’

তেজগাঁর কুনিপাড়া এলাকা। গ্যারেজের অভাব নেই এখানে। এলাকাটিতে বেশ কিছু ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা আগে প্যাডেলচালিত রিকশার ব্যবসা করতেন। বর্তমানে এখানে ৫০ থেকে ৬০টি গ্যারেজ রয়েছে। আশ্চর্য বিষয় হলো, এসব গ্যারেজের বেশিরভাগ অটোরিকশার মালিক সরকারি চাকরিজীবী। আর এসব গ্যারেজে থাকা বেশিরভাগ অটোরিকশা চার্জ করা হয় অবৈধপন্থায় নেওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে।

দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন আলতাফ হোসেন। তিনি ঢাকায় এসে প্রথমেই কিনে ফেলেন ২০টি অটোরিকশা। আস্তে আস্তে এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন তার অটোর সংখ্যা প্রায় ২০০টি। কেন অটো কিনলেন- এ প্রশ্নে তার সোজাসাপটা উত্তর, ‘একটা সিএনজি অটোরিকশা কিনতে টাকা লাগে ২৫ লাখ। আর ব্যাটারিচালিত অটো কিনতে খরচ পড়ে ৮০ হাজার টাকা। তা ছাড়াও এর জন্য কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না।’ 

পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালের পেছনে বিরাট গ্যারেজ। এ গ্যারেজে প্রায় ৪০০টি অটোরিকশা। এসব অটোর বেশির ভাগের মালিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী। একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে, আগারগাঁও বিএনপি বস্তির কাছাকাছি। সেখানেও অটোর বেশিরভাগ মালিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী। 

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় আবুল হোটেলের কাছাকাছি অটোরিকশার ব্যবসা করেন দেলোয়ার হোসেন। তার প্রতি অটোর দাম ১ লাখ টাকার উপরে। তিনি তার একমাত্র সন্তান আবুদল্লাহকে ব্যবসার হাল ধরিয়ে দিয়েছেন। দেলোয়ার হোসেন সরকারি চাকরি করতেন। তবে এখন অবসরে। 


ব্যাটাচালিত অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে আরেকটি অবৈধ ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠেছে। কিছুসংখ্যক অসাধু লোক ফুটপাথের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে হুক বাঁধিয়ে সরাসরি লাইন টেনে শত শত রিকশার ব্যাটারি চার্জ করছেন দিনরাত। এ চিত্র পাওয়া গেছে পুরো তেজগাঁ এলাকায়। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। একই দৃশ্য মালিবাগের গুলবাগ ও শান্তিবাগেও। 

জানা গেছে, অটোরিকশার জন্য ঢাকায় ৩ হাজার ৩০০টি চার্জিং পয়েন্ট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন ঢাকায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এতে সরকার একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
 
অন্যদিকে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে এসব অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে। 
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) মতে, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে অন্তত ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জে। 

অন্যদিকে অটোরিকশাচালকদের অনেকেই নেশাগ্রস্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, মধুবাগে রমজান মহাজনের ২০০টির বেশি অটোরিকশার চালকদের বেশিরভাগ অল্পবয়সি এবং নেশাগ্রস্ত। একই ভাবে গুলবাগ ও শান্তিবাগের ২০ শতাংশ চালকও নেশাগ্রস্ত। 

প্রসঙ্গত, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যাত্রা শুরু হয় রাজশাহী থেকে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০১০ সালে প্রথম ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়। রাজশাহীর পথ ধরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে অটোরিকশার প্রচলন। স্থানীয় প্রতিনিধিরা কোনো রকম কারিগরি সমীক্ষা ছাড়াই এসব যানবাহনের অনুমোদন দেওয়া শুরু করে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   অটোরিকশা  রাজনীতি  কালো টাকা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: