গরমে পুড়ছে ইউরোপের ক্ষেত-খামার, বিপর্যস্ত কৃষি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইউরোপের সবুজ প্রকৃতি এবারের গ্রীষ্মে ‘আগুনের রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। টানা তাপপ্রবাহ আর ভয়াবহ খরায়কৃষকরা পড়েছেন এক ‘অভূতপূর্ব’ সংকটে। বিশেষ করে

2026-08-19T04:45:30+00:00
2026-08-19T04:45:30+00:00
 
  বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
গরমে পুড়ছে ইউরোপের ক্ষেত-খামার, বিপর্যস্ত কৃষি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৫ এএম 
শুকিয়ে যাচ্ছে ফসল। সংগৃহীত ছবি
ইউরোপের সবুজ প্রকৃতি এবারের গ্রীষ্মে ‘আগুনের রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। টানা তাপপ্রবাহ আর ভয়াবহ খরায় কৃষকরা পড়েছেন এক ‘অভূতপূর্ব’ সংকটে। বিশেষ করে শাকসবজি ও শস্য উৎপাদনকারীরা ফসলের ‘বিপর্যয়কর’ ক্ষতির কথা জানিয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। খাবারের দাম বাড়ার শঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লাখ লাখ কৃষকের আর্থিক অনিশ্চয়তা। ইউরোপের বুকে এবারের খরা যেন ভয়ংকর এক কাঁটা হয়ে বিঁধেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী ফ্রান্সের সবজিচাষিরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন অত্যন্ত ‘উল্লেখযোগ্য হারে’ কমেছে। কাঁচামরিচ ২৫ শতাংশ, লেটুস ৩৫ শতাংশ, মটরশুঁটি ৪০ শতাংশ, ব্রুকলি ৬০ শতাংশ এবং আর্টিচোকের উৎপাদন কমেছে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ! ব্রিটানির ১ হাজার ৩০০-এর বেশি সবজি উৎপাদনকারী সংগঠন ‘প্রিন্স দ্য ব্রতাইন’ একে ‘ঐতিহাসিক সংকট’ আখ্যা দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, গ্রীষ্মজুড়ে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তো নামেইনি বরং ৩৫ ডিগ্রিতে বিরাজ করছিল। বৃষ্টি বলতে কিছু ছিলই না। তার ওপর সমানে প্রবাহিত হয়েছে গরম বাতাস। সব মিলিয়ে গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি সম্পূর্ণ থমকে গেছে। ফরাসি ক্যানড ও হিমায়িত সবজি উৎপাদনকারী সংস্থার এরিক লেগ্রাস সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সাধারণত কোনো অঞ্চল ভালো করলে অন্য অঞ্চলের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। কিন্তু এবার সব প্রধান ফসল উৎপাদনকারী অঞ্চল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুধু সবজি নয়, শস্য উৎপাদনেও দেখা গেছে ব্যাপক ধস। ইউরোপের বৃহত্তম শস্য উৎপাদনকারী দেশ ফ্রান্সে ভুট্টা উৎপাদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কমে মাত্র ৯০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৮০ সালের পর এত কম শস্য উৎপাদন হয়নি দেশটিতে। যদিও এর আংশিক কারণ কৃষকদের সূর্যমুখীর মতো ফসল চাষে আগ্রহী হওয়া। তবে মূল কারণই হলো চলমান ভয়ংকর তাপপ্রবাহ। এবারের দাবদাহ ফসল বৃদ্ধির সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়ে আঘাত হেনেছে।

এমনকি এই সংকট প্রাণিসম্পদের ওপরও প্রকট আকার ধারণ করছে। সাধারণত ২৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা দুগ্ধবতী গাভির ওপর প্রভাব ফেলে। অনেক খামারি ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, দুধ উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ কমে গেছে। এখন তারা শীতের খাদ্য সংকট নিয়ে চিন্তিত। ফ্রান্সের কৃষি পরিসংখ্যান দফতর জানিয়েছে, শীতে গবাদিপশুর খড় উৎপাদন ১৯৮৯-২০১৮ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম এবং এই ঘাটতি দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। ডিম উৎপাদনও বিপর্যয়ের মুখে। 

বিশেষ করে জুনের তাপপ্রবাহে হাঁস-মুরগির খামারে প্রাণঘাতী মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে। ফ্রান্সের জাতীয় ডিম প্রচার বোর্ড জানায়, স্বাভাবিকের চেয়ে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ডিম কম উৎপাদিত হচ্ছে।

শুধু ফ্রান্সই নয়। ইতালি থেকে স্পেন, পুড়ছে পুরো ভূমধ্যসাগর। ইতালির প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষিজমি এখন মৃদু থেকে তীব্র খরায় আক্রান্ত। ভুট্টা, ধান, সয়াবিন, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; দুধ উৎপাদন কমেছে ২০ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে দাবানল ও প্রচণ্ড ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি মিলিয়ে দেশটির কৃষি খাতের মোট ক্ষতি ৩ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে পো উপত্যকা যেখানে ইতালির প্রায় ৮০ শতাংশ ধান উৎপন্ন হয় সেখানকার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ইতালির দীর্ঘতম নদী পো-র পানি কমে যাওয়ায় চাষিরা তাদের ফসল বাঁচাতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিকল্প পদ্ধতিতে সেচ দিতে বাধ্য হয়েছেন।


স্পেনেও একই চিত্র। কাস্তিয়া ও লেওনে শস্য উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ, মাদ্রিদ অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ এবং আন্দালুসিয়ায় ২৪ শতাংশ কমেছে। ভেড়া ও ছাগলের দুধের উৎপাদনও যথাক্রমে ৬.৫ শতাংশ এবং ১০.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অলিভ অয়েল উৎপাদন অবশ্য গত বছর বেড়েছিল তবে চলতি বছরের হিসাব এখনও অনিশ্চিত। স্পেনের জাতীয় ওয়াইন ফেডারেশন ২০২৬ সালে উৎপাদন ২০ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে, কারণ আঙ্গুর আর্দ্রতার অভাবে ছোট হচ্ছে।

সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলো হাত বাড়িয়েছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার পাশাপাশি ২০২৭ সালের বাজেটে কাঠামোগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কৃষকরা প্রশ্ন তুলছেন এই অর্থ কি তাদের পোড়া জমি আবার সবুজ করে তুলবে? নাকি এ বছরই ইউরোপের সুপারমার্কেটে দু’বেলা খাবার জোগাতে হিমশিম খেতে হবে সাধারণ মানুষকে? সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন আর শুধু ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, এটা এখন ইউরোপিয়ানদের খাবারের প্লেটকেও চোখরাঙানি দিচ্ছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   গরম  পুড়ছে ইউরোপ  ক্ষেত  খামার  বিপর্যস্ত  কৃষি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: