দারিদ্র্য, অভাব আর দুর্গম পথ—কোনোটিই থামাতে পারেনি রেশমি আক্তার সুমাইয়ার অদম্য পথচলা। প্রতিদিন মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এই শিক্ষার্থী এবার এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫। কিন্তু সাফল্যের এই আনন্দের মাঝেই সামনে দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা—অর্থাভাবে কি থেমে যাবে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন?
রেশমি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের জালালিয়া গ্রামের দিনমজুর কাওসার আহমেদ ও রুশনা আক্তার দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট। চলতি বছর কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। পুরো বিদ্যালয় থেকে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী এই ফল অর্জন করেছে, তাদের একজন রেশমি।
সংসারে নিত্যদিনের অভাব। বাবা দিনমজুরি করে যে আয় করেন, তাতে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন। অর্থাভাবে বড় দুই মেয়ে উর্মি আক্তার পিনকি ও প্রমি আক্তারের পড়াশোনাও প্রায় এক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। তবু রেশমির পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে তার বাবা নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও মেয়ের শিক্ষার খরচ চালিয়ে গেছেন। কখনো নিজের খাবার কমিয়ে, কখনো বাড়তি শ্রম দিয়ে জুগিয়েছেন স্কুলের বেতন ও পড়ার খরচ। আর মা সংসারের নানা কাজ থেকে মেয়েকে দূরে রেখে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
রেশমি জানায়, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছে সে। নিজের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগের পাশাপাশি শিক্ষকদের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কৃষ্ণ পদ শীল ও শ্যামল কুমার সিংহ তাকে বিনামূল্যে কোচিং করানোর পাশাপাশি সহায়ক বইও কিনে দিয়েছেন।
রেশমির ভাষায়, ছোটবেলা থেকেই বাবার কষ্ট দেখে মানুষের সেবা করার ইচ্ছা তার মধ্যে তৈরি হয়েছে। সেই থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নই অনিশ্চয়তার মুখে। ভালো কোনো কলেজে ভর্তি, বই-খাতা ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই পরিবারের।
রেশমির বাবা কাওসার আহমেদ বলেন, ‘পাঁচ সদস্যের পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দিন আনি, দিন খাই। সামান্য ভিটেমাটি ছাড়া আমাদের আর কোনো সম্পদ নেই। অভাবের কারণে বড় দুই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছে। রেশমির ফলাফলে আমরা আনন্দিত, কিন্তু এখন কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে মেয়েটার স্বপ্নটা হয়তো বেঁচে থাকবে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মোমিন বলেন, রেশমি অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও অধ্যবসায়ী। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও তার পড়াশোনার প্রতি যে নিষ্ঠা, তা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রেশমি ভবিষ্যতে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর এখন রেশমির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া।
সময়ের আলো/এসএকে