ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের তেল রাজস্ব ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের পথ বন্ধ করে দেশটির অর্থনীতিকে এমন পর্যায়ে নিতে চাইছে ওয়াশিংটন, যাতে ইরান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়। তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে চীনের ওপর।
প্রায় ছয় মাসের যুদ্ধের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করেছেন ট্রাম্প। তিনি এটিকে ‘যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শুধু ইরান নয়, দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করা ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ওয়াশিংটনের নতুন কৌশলের লক্ষ্য হলো ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তেহরানের তেল বিক্রির আয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শিপিং নেটওয়ার্ক এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিভিন্ন বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
তেল রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
ইরানের বৈদেশিক আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস তেল। তাই দেশটির তেল রফতানি বন্ধ করাই ট্রাম্পের পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধের কারণে দেশটির তেলবাহী ট্যাংকারে পণ্য বোঝাই ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের তুলনায় ইরানের তেল চালান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ইরানের তেল পরিবহনে সহায়তাকারী জাহাজ, ট্যাংকার, জাহাজ নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে অর্থ লেনদেনে জড়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানো হচ্ছে। নগদ অর্থ স্থানান্তর, বিনিময় কেন্দ্র, ভুয়া বা বেনামি কোম্পানি এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিভিন্ন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের এই নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো হলে তা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্যই নতুন পরাজয় ডেকে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তিনি।
কেন চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ট্রাম্পের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে চীনকে ঘিরে। ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় অবশিষ্ট ক্রেতা চীন। ফলে তেহরানের তেল বিক্রির পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে চীনা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও চাপ দিতে হবে ওয়াশিংটনকে।
এখানেই ট্রাম্পের জন্য তৈরি হচ্ছে বড় কূটনৈতিক ঝুঁকি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে চীনের বড় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত তৈরি হতে পারে।
তবে চীনের মতো বড় ক্রেতার মাধ্যমে ইরানের তেল বিক্রি অব্যাহত থাকলে ট্রাম্পের ‘নজিরবিহীন বিচ্ছিন্নতা’ তৈরির পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকবে।
এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে তেহরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ সংকুচিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটে ইরান
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই গভীর সংকটে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আশঙ্কা, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হতে পারে। এটি প্রায় চার দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকোচন হতে পারে।
একই সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দরও রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। ফলে সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে ক্রমেই বেশি চাপের মুখে পড়ছেন।
তেলের ওপর নতুন করে অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। অবরোধের বাইরে ইরানের কাছে এখনও প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। এর বড় অংশ চীনে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, এই তেল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার আয় হতে পারে।
তবে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল হারে তেল রপ্তানি হলে এই মজুত থেকে প্রায় চার মাসের রপ্তানি আয় পাওয়া সম্ভব।
কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে আকস্মিক পতনের বদলে ‘ধীর মৃত্যুর’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অর্থনৈতিক চাপেই কি ভেঙে পড়বে তেহরান?
এখানেই ট্রাম্পের কৌশলের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। দশকের পর দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকতে ইরান বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শিপিং কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও বাণিজ্যপথের একটি জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিতে বড় আঘাত করলেও তেহরান কত দ্রুত নতি স্বীকার করবে, তা নিশ্চিত নয়।
ইউরেশিয়া গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু মনে করেন, ইরানের নেতৃত্ব আরও দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক দুর্ভোগ সহ্য করতে প্রস্তুত। তাঁর মতে, তেহরান বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা এবং মাসের পর মাস যুদ্ধ সহ্য করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গবেষণা বিভাগের ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানিয়েল সিট্রিনোভিচও মনে করেন, কেবল অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরান ভেঙে পড়বে— এমন ধারণা ভুল হতে পারে। তাঁর মতে, কঠোর অর্থনৈতিক চাপও তেহরানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে মৌলিক পরিবর্তন নাও আনতে পারে।
এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও ইরানে এমন কোনো ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়নি, যা সরাসরি দেশটির শাসনব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে।
এবার লড়াইটা সহনশীলতার
ট্রাম্পের পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করতে পারে কোন পক্ষ বেশি সময় ধরে চাপ সহ্য করতে পারে তার ওপর।
ইরানের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তেহরান হয়তো হিসাব করছে, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ, তেলের উচ্চমূল্য, যুদ্ধের রাজনৈতিক ব্যয় এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ ট্রাম্পের জন্যও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম ইতোমধ্যে প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের বেশি। ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে গিয়ে যদি তেলের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তেলের দাম বাড়লে ট্রাম্পকে সামরিক সংঘাত আরও বাড়ানো অথবা দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা— এই দুইয়ের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
তাই ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান কেবল নিষেধাজ্ঞার লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে দীর্ঘস্থায়ী সহনশীলতার প্রতিযোগিতা।
প্রশ্ন এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কতটা অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারবে, তা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে— এই চাপের মধ্যে কোন পক্ষ আগে পিছু হটবে, ওয়াশিংটন নাকি তেহরান?
সময়ের আলো/জেডি