যুদ্ধ-সংঘাতে নীরবে ধ্বংস হচ্ছে জলবায়ু

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক যুদ্ধ, সংঘাত ও বোমাবাজি চলছে। ইউক্রেন, গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, ইরান; কোথাও বিমান হামলা, কোথাও

2026-08-21T05:35:24+00:00
2026-08-21T05:35:24+00:00
 
  শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধ-সংঘাতে নীরবে ধ্বংস হচ্ছে জলবায়ু
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৫ এএম 
প্রতীকী ছবি
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক যুদ্ধ, সংঘাত ও বোমাবাজি চলছে। ইউক্রেন, গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, ইরান; কোথাও বিমান হামলা, কোথাও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, কোথাও বিস্ফোরণ। আমরা সাধারণত যুদ্ধের ক্ষতি হিসেবে শুধু মানুষের প্রাণ, বসতবাড়ি কিংবা অবকাঠামোর ক্ষতি দেখি। কিন্তু এর বাইরে আরও এক বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। যা সরাসরি চোখে পড়ে না। প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি যুদ্ধ বিমানের উড়ান, প্রতিটি ধ্বংসস্তূপ নীরবে প্রভাব ফেলে চলেছে আমাদের গ্রহের আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ুর ওপর। 

এক একটি বিস্ফোরণে বায়ুমণ্ডলে মিশছে বিষাক্ত গ্যাস, পাল্টে যাচ্ছে আবহাওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম। জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ হুমায়রা কাসিম বলেন, বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের সময় রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রচুর গ্যাস ও ক্ষুদ্র কণা বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। বারুদ মূলত পটাসিয়াম নাইট্রেট, সালফার ও কার্বনের সমন্বয়ে তৈরি। এটি পুড়ে কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত করে। এই গ্যাসগুলো বায়ুদূষণ বাড়ায়, অম্লবৃষ্টি সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।

গবেষণা বলছে, সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড বায়ুর জলীয়বাষ্পের সঙ্গে মিলে অ্যাসিড তৈরি করে। যা অমøবৃষ্টি হিসেবে পৃথিবীতে ফিরে আসে। পরিবেশনীতি-বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নির্গত এই গ্যাসগুলো মেঘের সঙ্গে মিশে বৃষ্টির রসায়নকে পাল্টে দেয়। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ধরণ ভেঙে পড়ে। কখনো বৃষ্টি হয়ই না, আবার কখনো শুরু হয় বিষাক্ত বৃষ্টিপাত।

বিস্ফোরণ থেকে নির্গত ক্ষুদ্র কণা মেঘ তৈরির বীজ হিসেবে কাজ করে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা হলো, এই কণাগুলো বাতাসে ভাসমান থাকলে মেঘ স্বাভাবিকের চেয়ে পাতলা বা অস্বাভাবিকভাবে ঘন হয়ে যেতে পারে। ফলে সূর্যালোক পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাপমাত্রা হঠাৎ বাড়ে বা কমে যায়। বাতাসের প্রবাহও প্রভাবিত হয়। কখনো কখনো এই ধোঁয়া ও কণা বায়ুমণ্ডলের ওপর স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেলে সেখানে বছরের পর বছর ঘুরতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।


ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম ১৮ মাসেই শুধু সামরিক কার্যক্রম থেকে প্রায় ৭৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়েছে। যা অস্ট্রিয়া বা পর্তুগালের মতো সম্পূর্ণ দেশের বার্ষিক নির্গমনের চেয়ে বেশি। ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামরিক কার্বন নিঃসরণও ২০২১ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু সংরক্ষণের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কার্বন নির্গমন বাড়াছে। বর্তমান জলবায়ু পূর্বাভাসগুলোয় যুদ্ধের প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অন্যদিকে তেলকূপ, জ্বালানি মজুদঘর বা শিল্পকারখানায় আগুন লাগলে তা দিনের পর দিন জ্বলতে থাকে। সেই আগুন থেকে নির্গত কালো কার্বন বা কালো ধোঁয়া বিশেষভাবে বিপজ্জনক। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা হলো, কালো কার্বন সূর্যালোক শোষণ করে তাপ সৃষ্টি করে। এটি মেরুদেশ বা পাহাড়ের বরফের ওপর জমলে বরফকে দ্রুত গলিয়ে দেয়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন পাল্টে যায়। গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বহু ভবন, গাছপালা ও শিল্পস্থাপনা পুড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ কালো কার্বন বায়ুমণ্ডলে মিশে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে গাছপালা পুড়ে ছারখার হয়, বিষাক্ত হয়ে ওঠে মাটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছপালা হলো প্রকৃতির ‘কার্বন শোষক’ যা বায়ু থেকে কার্বন গ্রহণ করে বিশ্বকে শীতল রাখে। যখন বন বা বৃক্ষরাজি ধ্বংস হয়, তখন সেই কার্বন শোষণের ক্ষমতা নষ্ট হয়। সঙ্গে সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। ফলে সেই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়, তাপমাত্রা বাড়ে, খরা দেখা দেয়। আবার নদী ও সমুদ্রে বিষাক্ত পদার্থ মিশলে সামুদ্রিক ক্ষুদ্র জীব ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নষ্ট হয়। এই ক্ষুদ্র জীব বিশ্বের প্রায় অর্ধেক অক্সিজেন তৈরি করে এবং প্রচুর কার্বন শোষণ করে।

সমুদ্র গবেষকদের সতর্কবাণী হলো, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের সংখ্যা কমে আরেকটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত। তা হলো, যুদ্ধের ধোঁয়া ও দূষণ সীমিত থাকে না। বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে তা সীমান্ত পার হয়ে অন্য দেশে পৌঁছায়। হুমায়রা কাসিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বা ইউক্রেনের বিস্ফোরণের ধোঁয়া ও গ্যাস বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে। ফলে সংঘাত থেকে দূরে থাকা দেশগুলোও বায়ুদূষণ ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার শিকার হচ্ছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি আরও বাড়ছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ার পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংরক্ষণের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, আমরা যদি জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে চাই, তবে বিশ্বব্যাপী সংঘাত বন্ধ করাও ততটাই জরুরি যতটা জরুরি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো। কারণ প্রতিটি বোমা, প্রতিটি বিস্ফোরণ আমাদের গ্রহকে আরও বিপন্ন করে তুলছে। কারণ যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট সতর্কবাণী হলো, প্রতিটি বোমার বিস্ফোরণ, প্রতিটি জ্বালানির আগুন, প্রতিটি ধ্বংসস্তূপ নীরবে ধ্বংস করছে বিশ্বের আবহাওয়াকে। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়াচ্ছে, মেঘ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে ফেলছে, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। আর এই প্রভাব সীমিত থাকছে না; ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বজুড়ে। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা মানুষের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি গ্রহ ও আবহাওয়াকে বাঁচানোর জন্যও অত্যাবশ্যক।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা


  বিষয়:   যুদ্ধ  সংঘাত  নীরবে ধ্বংস হচ্ছে জলবায়ু  জলবায়ু  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: