কক্সবাজারের মহেশখালী এলাকায় এলএনজির ভাসমান দুই টার্মিনাল সক্রিয় আছে। ক্ষমতার সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহে প্রস্তুত। কিন্তু সর্বোচ্চ পরিমাণে গ্যাস সরবরাহের মতো কার্গো নেই। আগে মাসে ১০ কার্গো এলএনজি সরবরাহ আসত মহেশখালীতে। এখন কার্গো সরবরাহ ৫-৬টিতে নেমে এসেছে। বর্তমানে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে।
তবে দুই টার্মিনাল থেকে ক্ষমতার সমান সরবরাহ হচ্ছে না। এতে গ্যাস সংকট থেকেই গেছে। আগের মতো কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহের প্রতীক্ষায় আরপিজিসিএল। অন্যথায় দৈনিক এলএনজি সরবরাহ ১১শ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা সম্ভব হবে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। শনিবার রাত ১০টার পর মহেশখালীর দুই টার্মিনাল থেকে এলএনজির সরবরাহ ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। রোববার বিকাল পর্যন্ত একই হারে সরবরাহ হয়েছে। তবে স্বাভাবিক সময়ের মতো দৈনিক ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ এখনই শুরু হচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে প্রধান উৎস কাতার থেকে সরবরাহ এখনও আমদানি স্বাভাবিক হয়নি। কাতারের বহু গ্যাস ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নানা সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হচ্ছে কম। কাল মঙ্গলবার বা বুধবার ৬৫ হাজার মেট্রিকটন এলএনজিবাহী একটি জাহাজ ভিড়বে মহেশখালীতে। পরের শিডিউল এলএনজিবাহী জাহাজ কবে আসবে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এলএনজির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
আরপিজিসিএলের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, শনিবার রাত ১০টার পর থেকে এক্সিলারেট ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিট ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস সরবরাহ করছে। দুই টার্মিনাল থেকে মোট ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট করে সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে আগে ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন সরবরাহ আসছে অর্ধেকের কিছু বেশি।
নতুন কার্গো বা এলএনজিবাহী জাহাজ কবে আসছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আগামী ২৫ বা ২৬ আগস্ট ৬৫ হাজার মেট্রিকটন এলএনজি নিয়ে একটি জাহাজ ভিড়বে মহেশখালীতে। এরপর আরও এক কার্গো এলএনজি আসবে। তবে শিডিউল ঠিক হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরে আসা এলএনজিবাহী জাহাজের শিপিং এজেন্ট ইউনিগ্লোবাল বিজনেস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, কাতার থেকে অনেক দিন এলএনজি আমদানি হয় না। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধের পর আমদানি বন্ধ আছে। এখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হচ্ছে। আগামী ২৫ থেকে ২৬ আগস্ট এলএনজি নিয়ে একটি জাহাজ ভিড়বে। এটিও স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজি বহন করছে।
কাতারের এলএনজির প্রতীক্ষা : বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলএনজি সরবরাহের বড় উৎস ছিল কাতার। এলএনজি সরবরাহে বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও আছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং গ্যাস ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব পড়েছে এলএনজি সরবরাহে। কাতার বাংলাদেশে চুক্তির এলএনজি সরবরাহ করতে পারেনি।
কাতারের দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে চলতি বছর ৪০ কার্গো এলএনজি আসার কথা ছিল। আগস্ট পর্যন্ত এসেছে মাত্র ১২টি। তা-ও সরাসরি কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ আসেনি। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এসব এলএনজি সরবরাহ হয়েছে। কাতার থেকে কার্গো আসা বন্ধের পর বাংলাদেশে জ¦ালানি সেক্টরে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন স্পট মার্কেট থেকে কিনে এতদিন এলএনজির চাহিদা সামাল দেওয়া গেছে। স্পট মার্কেট থেকে কার্গো বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে দেরি এবং ভাসমান টার্মিনালে গোলযোগের জেরে দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে যায়।
গত এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এলএনজি সরবরাহে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। এতে দেশজুড়ে দেখা দেয় তীব্র গ্যাস সংকট। বাসার চুলা থেকে যানবাহন, শিল্প-কারখানা সবখানে সংকটের ভয়াবহ রূপ চোখে পড়ে।
কাতার থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় সংকটের সৃষ্টি উল্লেখ করে উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্রধান উৎস কাতার থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এরপরই মূলত এলএনজি আমদানি এলোমেলো হয়ে গেছে। আগে মাসে গড়ে ১০ কার্গো এলএনজি সরবরাহ আসত। প্রায় সবই আসত কাতার থেকে। বর্তমানে মাসে আমদানির গড় হিসাবে ৫-৬ কার্গোতে নেমে এসেছে। কাতার থেকে আমদানি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। কাতার থেকে আমদানি স্বাভাবিক হলে এলএনজির সংকট অনেক কমে যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, গ্যাসের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন-উৎপাদন জড়িত। তীব্র গ্যাস সংকটের সময় বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। তাই উৎপাদন সচল রাখতে যেভাবেই হোক এলএনজির আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজি নির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাস কূপ খননেও জোর দিতে হবে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিএসএল) কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে চাহিদার সমান সরবরাহ এখনও শুরু হয়নি। চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদা ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। সরবরাহ হচ্ছে অনেক কম। তারপরও সরবরাহ আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় সংকট সাময়িকভাবে কমেছে। দুই টার্মিনাল থেকে ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ শুরু হলে কোনো সংকট থাকবে না।
প্রসঙ্গত, গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের জেরে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে মেরামত শেষে ১৫ আগস্ট টার্মিনালের অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। কিন্তু এলএনজিবাহী নতুন কোনো জাহাজ ভিড়েনি। পুরোনো মজুদ থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু করলেও চাহিদার তুলনায় ছিল কম। এক্সিলারেট বন্ধের পর থেকেই সক্ষমতার বেশি সরবরাহ করে আসছে সামিট। এর মধ্যে একবার সামিট থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ সময় দেশজুড়ে বাসাবাড়ি, শিল্প-কারখানায় সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটে।
এরই মধ্যে এলএনজিবাহী নতুন জাহাজ এসেছে বঙ্গোপসাগরে। একটি জাহাজ এক্সিলারেট টার্মিনালে যুক্ত হয়েছে। টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর গত শনিবার বিকাল থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে এক্সিলারেট। এর আগে টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ে।
তবে এলএনজির নতুন কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমতে কমতে গত বুধবার বিকালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শনিবার জাহাজ আসার পর এলএনজি সরবরাহ আবার শুরু হয়। জাহাজ ভেড়ার পরই দ্রুত সময়ে টার্মিনালে যুক্ত করা হয়।
সময়ের আলো/এসএকে