ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি ওশান উইনার’ এর বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ আব্দুল আল মামুন সাতক্ষীরা শহরের আমতলা এলাকার ডক্টর আব্দুর রহিমের ছেলে।
জাহাজডুবির পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে।
আল মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, গত বুধবার পরিবারের সাথে মামুনের সর্বশেষ কথা হয়েছিল। গত শনিবার দুপুরের দিকে পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভারতের ওড়িশা উপকূলে বঙ্গোপসাগরে একটি জাহাজ ডুবির খবর পান তারা। তবে এখন পর্যন্ত মামুনের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
ভারতীয় কোস্টগার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। পরে জাহাজটি ডুবে যায়। এতে ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন চীনের, তিনজন মিয়ানমারের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক। জাহাজডুবির পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের সন্ধানে অভিযান চলছে।
মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি পরিবারের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে আরও বলেন, আম্মুর আগে থেকেই হার্টের সমস্যা আছে, আব্বুরও বয়স হয়েছে। মামুনের ঘটনা জানার পর থেকে পরিবারের সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মামুনের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বারবার। মামুনের বিষয়ে এখন কোনো দিক থেকে আপডেট পাচ্ছি না। জাহাজডুবি সংক্রান্ত কোনো খবর ইন্ডিয়ান কোস্টগার্ডের পেজে কখন আপডেট হয়, তারা কোনো ব্রিফিং করে কিনা সেটার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।
মামুনের ডাকনাম মানিক। তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জাহাজে কর্মরতত ছিলেন। প্রায় চার মাস সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর ভারতের ওড়িশা থেকে সিঙ্গাপুরগামী ‘এমভি ওশান উইনার’ জাহাজে যোগ দেন তিনি।
মামুনের মেজো ভাই আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, আমরা আমার ভাইকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই। সরকারের কাছে আমরা সঠিক তথ্য চাই। আল্লাহ যেন তাকে সুস্থভাবে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।
জাহাজটির ২৪ জন ক্রুর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি ছিলেন মামুন। দুর্ঘটনার পর দুজনকে জীবিত উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও তারা কেউ বাংলাদেশি নন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দুজনই চীনের নাগরিক।
মামুনের খোঁজের বিষয়ে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করছেন বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজু। তিনি জানান, গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ‘এমভি ওশান উইনার’ জাহাজে যোগ দেন মামুন। ওড়িশা উপকূল থেকে জাহাজ ছাড়ার রাতে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তার সাথে মামুনের সর্বশেষ কথা হয়। তারপর জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। সাদাত আরও বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথেও যোগাযোগ রাখছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির কাছেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি ওশান উইনার’ ওডিশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। জাহাজটি প্রায় ২২৫ মিটার দীর্ঘ। এতে প্রায় ৭২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন লৌহ আকরিক ছিল।
২২ আগস্ট বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটের দিকে সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পায়। এরপর কাছাকাছি থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমটি আইসোপোস’কে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ডের ‘বরদ’, ‘আনমোল’ ও ‘বিজিত’ জাহাজও অভিযানে নামে।
রাতে লাইফ র্যাফট থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে আকাশ ও সমুদ্রপথে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাকি ২২ জনের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। জাহাজটি কী কারণে ডুবে গেছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানান, জাহাজ ডুবির ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে তিনি ইতোমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিচ্ছেন।
সময়ের আলো/আতা