নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার হলেও দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বরং অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সামষ্টিক সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে। মাত্র ১২টি সূচকে অগ্রগতি দেখা গেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা, বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যে অবনতি অর্থনীতির দুর্বল চিত্রই তুলে ধরছে। তবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমা, রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার মতো কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তনও রয়েছে।
সোমবার (২৪আগস্ট) রাজধানীতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস : একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির পর্যালোচনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ। একই সময়ে এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশ এবং মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
রাজস্ব সংকটের পাশাপাশি সরকারের ব্যাংকনির্ভরতাও বেড়েছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক সহায়তা ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প খাতের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
বিনিয়োগেও মন্দাভাব স্পষ্ট। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহ ও কার্গো গ্রহণে জটিলতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশে উঠলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনও নেতিবাচক। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি।
বাণিজ্য খাতেও মিশ্র চিত্র রয়েছে। রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে এবং চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সিদ্ধান্তে দেরি নিয়েও সতর্ক করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত যত দেরি হবে, সমস্যা তত বাড়বে। বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখলে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এর প্রভাব সরকারের অন্যান্য কার্যক্রমেও পড়তে পারে। তাই এ বিষয়ে দ্রুত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকার যে বেতন কাঠামোর প্রতিবেদন দিয়ে গেছে, সেটি মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের একটি সুপারিশ এসেছিল এবং সংশ্লিষ্ট সবাই তা মেনেও নিয়েছিলেন।
সে ক্ষেত্রে শুরুতেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য কিছুটা সময় নেওয়া যেত। তা হলে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলিয়ে রাখায় এখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না এবং যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ ছিল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে সরকার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেনি। ফলে এখন সরকার কোন পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নিয়েছিল এবং ছয় মাসে অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, সরকার বারবার দাবি করছে যে তারা একটি খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল না থাকায় সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করা কঠিন হচ্ছে। এ কারণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলাফলও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা যাচ্ছে না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল- অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ছয় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এসব ক্ষেত্রে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
সংস্কার কর্মসূচিতেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এখনও একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা স্পষ্ট নয়। ইশতেহারে যেসব কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকটা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সরকারের প্রতিশ্রুতি ও গৃহীত পদক্ষেপ মূল্যায়নে সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা করেছে জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, এসব পদক্ষেপকে ৯টি ভাগে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা পর্যালোচনায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগের মতো কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক। তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের মতো বিষয়গুলো উদ্বেগ তৈরি করছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, এসব ক্ষেত্রে তারও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনকে নিয়ে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরেই সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে