জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছেন ৬৪০৬৩১৯ জন ভোটার। ছয়টি ক্যাটাগরিতে করা এসব আবেদনের মধ্যে ‘ক-১’ ক্যাটাগরিতে আবেদন করেছেন ১৪০১২৯ জন। এ ছাড়া ‘ক’ ক্যাটাগরিতে ৪১৪২০৭৩ জন, ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতে ১১১১৯৭ জন, ‘খ’ ক্যাটাগরিতে ১২৪৮৩৯৩ জন, ‘গ’ ক্যাটাগরিতে ৬০৪৪২০ জন ও ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে সংশোধনের জন্য আবেদন করেছেন ১৬০১০৭ জন ভোটার।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদন নিয়ে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১১ আগস্ট পর্যন্ত একটি তুলনামূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ। ইসির তৈরি ওই প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এনআইডি সংশোধনের কাজ সহজ করতে ২০১৬ সালে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয় নির্বাচন কমিশন। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদনগুলো ভুল বা পরিবর্তনের পরিধির ওপর ভিত্তি করে ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে দেয় ইসি। এসব ক্যাটাগরির মধ্যে নামের বানানগত সামান্য ভুল, শিক্ষাগত যোগ্যতার আংশিক পরিবর্তন বা ব্লাড গ্রুপের মতো ছোট ভুলগুলো সংশোধনের জন্য ‘ক-১’ ক্যাটাগরির দায়িত্ব দেওয়া হয় সহকারী উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তাকে।
এ ছাড়া মূল নাম ঠিক রেখে আংশিক পরিবর্তন, পিতা-মাতার নামের পদবি পরিবর্তন ও সর্বোচ্চ ৩ বছর জন্মতারিখ পরিবর্তন বা ঠিকানা সংশোধনের জন্য ‘ক’ ক্যাটাগরির দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে। ‘খ-১’ ও ‘খ’ ক্যাটগরির সংশোধনের দায়িত্ব যেমন- পিতা-মাতার নামের আমূল পরিবর্তন, সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত জন্মতারিখ পরিবর্তন, বৈবাহিক অবস্থা সংযোজন-বিযোজন বা ছবি পরিবর্তনের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে।
এ ছাড়া নিজ বা অন্য কারও নামের আমূল পরিবর্তন, সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত জন্মতারিখ পরিবর্তন বা স্থায়ী ঠিকানায় বিভাগীয় পরিবর্তনের জন্য ‘গ’ ক্যাটাগরির দায়িত্ব দেওয়া হয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে এবং ১০ বছরের বেশি জন্মতারিখ পরিবর্তন কিংবা নাম ও অন্যান্য তথ্যের জটিল বা আমূল পরিবর্তনের জন্য ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় এনআইডির মহাপরিচালকে।
পরে ভোটারদের ভোগান্তি কমাতে ২০২০ সালে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এই ৪টি মূল ক্যাটাগরি তৈরি করে মাঠ পর্যায়ের ও কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষমতা স্পষ্ট করে দেয় ইসি। ‘ক’ ক্যাটাগরি বা সাধারণ ভুলত্রুটির ক্ষমতা দেওয়া হয় উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসার হাতে। ‘খ’ ক্যাটাগরি বা মধ্যম সারির ভুল ও আংশিক বয়স সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হয় সিনিয়র জেলা বা জেলা নির্বাচন অফিসারের কাছে। ‘গ’ ক্যাটাগরি বা জটিল নাম ও বয়স সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হয় আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসারের কাছে এবং ‘ঘ’ ক্যাটাগরি বা সবচেয়ে জটিল পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয় এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) হাতে।
‘ঘ’ ক্যাটাগরির বেশিরভাগ আবেদনই বয়স বাড়ানো বা কমানো সংক্রান্ত। তাই ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদনগুলোকে অত্যন্ত জটিল হিসেবে গণ্য করা হয়। এ জন্য ২০২৩ সালে ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা এককভাবে ন্যস্ত করা হয়েছে এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালকের হাতে। তবে এতে করে সমস্যা আরও বেড়ে গেছে। ছোটখাটো বয়স সংশোধনের জন্যও একজন ভোটারকে উপজেলা বা জেলা শহর থেকে ঢাকার আগারগাঁওয়ের প্রধান কার্যলয়মুখী হতে হয় এবং মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এতে করে ভোগান্তি বেড়েছে বহুগুণ।
তাই বয়স সংশোধনের কিছু ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষে আবারও মাঠ পর্যায়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে গত ১৩ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করেছে সংস্থাটি। এতে বলা হয়েছে, অনলাইনে যাচাইযোগ্য জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকে (এসএসসি) বা সমমান শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিভুক্ত হিসেবে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসার ও সিনিয়র জেলা বা জেলা নির্বাচন অফিসার এবং এনআইডি উইংয়ের সহকারী পরিচালক বা উপপরিচালক নিষ্পত্তি করতে পারবেন। শিক্ষা সনদের পাশপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রমাণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘এসওপি’ অনুসরণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, সংশোধনের আবেদন ইলেকট্রনিক্যালি অনুমোদন বা বাতিলের ক্ষেত্রে কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিএমএস) আবশ্যিকভাবে নোট দিতে হবে। পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, ‘আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা তাদের অধীন অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্তৃক সম্পন্নকৃত কার্যক্রম মনিটরিং করবেন এবং দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রত্যেক নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার ন্যূনতম তিনটি আবেদন যথাযথভাবে নিস্পত্তি হয়েছে কি না তা সংযুক্ত ছকে প্রতিবেদন প্রস্তুতপূর্বক পরিচালকের (অপারেশ) ইন্টারনাল অ্যাকাউন্টে প্রেরণ করবেন। এ ছাড়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অনুসারে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন এবং জন্মতারিখসহ নিজ নাম ও পিতা/মাতার নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তন সংক্রান্ত আবেদন মহাপরিচালক পর্যায়ে নিষ্পতিযোগ্য হবে। জন্মতারিখ, নিজ নাম ও পিতা-মাতার নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একই ফিল্ডে দ্বিতীয়বার সংশোধন করা যাবে না।’
প্রতিদিন কতটি করে সংশোধনের ফাইল অনুমোদন করছেন এবং আবেদনের এই স্তূপ কত বছরে শেষ হতে পারে- জানতে চাইলে এনআইডি মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল হাসনাত মুহম্মদ আনোয়ার পাশা সময়ের আলোকে বলেন, আমি প্রতিদিনই কাজ করছি। তবে কত বছরে শেষ হবে বলতে পারছি না। এ বিষয়ে সচিব স্যারের সঙ্গে কথা বলেন। কারণ উনি স্পোক পারসন। এ ছাড়া পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন ওনার কাছে সব হিসাব আছে। এরপর জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ওই পরিচালকের ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এনআইডি সেবা। বর্তমানে আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর পাওয়া, শেয়ার আবেদন ও বিও হিসাব খোলা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স করা, পাসপোর্ট করা ও নবায়ন, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, চাকরির আবেদন, বীমা স্কিমে অংশগ্রহণ, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাব খোলা, নির্বাচনে ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংক ঋণ, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংযোগ, সরকারি বিভিন্ন ভাতা উত্তোলন, টেলিফোন ও মোবাইল ফোন সংযোগ, সরকারি ভাতা, সাহায্য ও সহায়তা, ই-টিকেটিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর পাওয়া, সরকারি ভাতার ও সিকিউরড ওয়েব লগে ইন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে এনআইডি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে মোট ভোটার রয়েছেন ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৩১ জন, নারী ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন। আর হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৪৩ জন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি