ইউক্রেনে সম্ভাব্য শীতকালীন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যে রাশিয়ায় সেনা নিয়োগের তৎপরতা আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে। এ নিয়ে দেশটিতে নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কা বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে ও চাপ প্রয়োগ করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগও উঠেছে।
রাশিয়ার কাজাখস্তান সীমান্তসংলগ্ন ওরেনবুর্গের ২৬ বছর বয়সী সাশা এমনই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অসুস্থতার কারণে তার সামরিক পরিচয়পত্রে এমন একটি শ্রেণি রয়েছে, যার আওতায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা নয়। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেই নিয়ম কার্যকর নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
২০২২ সালে আংশিক সেনা সমাবেশ ঘোষণার আগে সাশা কাজাখস্তানে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় তার বর্তমান প্রেমিকার সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে দুজনই দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
তবে গত এক বছরে তাদের উদ্বেগ বেড়েছে। সাশা বলেন, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি হয়েছে। তারা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছেন এবং বিষণ্নতার ওষুধও সেবন করছেন।
তিনি জানান, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তিনি বাড়ি থেকে বের হন না এবং একা থাকার বিষয়টিও এড়িয়ে চলেন।
গাড়িতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৬২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে পেনজা এলাকায় গত জুন থেকে জোরপূর্বক সেনা নিয়োগের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক ভিডিওতে দেখা গেছে, সাধারণ পোশাকে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি সামরিক বয়সী পুরুষদের জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছেন। এ সময় কান্নারত নারীরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউক্রেনে জোরপূর্বক সেনা নিয়োগের সময়কার দৃশ্যের সঙ্গে এসব ঘটনার মিল রয়েছে।
এ ছাড়া সম্ভাব্য সেনা সদস্যদের প্রশাসনিক নানা অজুহাতে পুলিশ স্টেশনে ডেকে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তাদের মারধর বা ভয় দেখিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি কারও কাছে মাদক রেখে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের ভয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে।
তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, যারা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং ইতোমধ্যে সেনা সমাবেশের আওতায় পড়েছেন, শুধু তাদেরই খোঁজা হচ্ছে। এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া বাসিন্দাদের বিরুদ্ধেও তারা অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছে।
দুর্বলদের টার্গেট করার অভিযোগ
রাশিয়ার সেনা নিয়োগের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন স্কুল অব দ্য কনস্ক্রিপ্টের মিখাইল লিবারভ বলেন, নিয়োগকারীরা সাধারণত এমন ব্যক্তিদের বেছে নেন, যারা কোনো না কোনো কারণে প্রলোভন, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা চাপের কাছে সহজে নতি স্বীকার করতে পারেন।
তার মতে, এ তালিকায় মাদকাসক্ত, মদ্যপ, মানসিকভাবে অসুস্থ, বিপুল ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি এবং রুশ ভাষা ভালোভাবে না জানা অভিবাসীরাও রয়েছেন। অভিবাসীদের অনেকেই নির্বাসনের ভয়েও সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হতে পারেন।
৩৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদেরও সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বড় অঙ্কের অর্থ ও ‘নায়ক’ হওয়ার সুযোগ দেখিয়ে কাউকে প্রলুব্ধ করার পর কারাদণ্ডের ভয় দেখানো হয় বলেও দাবি করেন লিবারভ।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রাশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাতভ মনে করেন, পেনজার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশজুড়ে পরিচালিত কোনো পরিকল্পিত কার্যক্রম নয়। বরং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে বিচ্ছিন্নভাবে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
‘সেনা সমাবেশ হবেই’
নতুন করে সেনা নিয়োগের এসব ঘটনা এমন সময় সামনে এসেছে, যখন রাশিয়ায় সম্ভাব্য নতুন সেনা সমাবেশ নিয়ে গুঞ্জন চলছে। একই সঙ্গে চলতি শীতকালে ইউক্রেনে রাশিয়ার নতুন অভিযান শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই অভিযানে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা আরও বাড়তে পারে।
লিবারভ বলেন, কোনো বড় পরিবর্তন না হলে রাশিয়ায় আবারও সেনা সমাবেশ হবে বলে তিনি ধরে নিয়েছেন। তার মতে, আগামী এক বছরের মধ্যে রাশিয়া নতুন করে সেনা প্রস্তুত করতে পারে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আংশিক সেনা সমাবেশের অনুমোদন দিয়ে একটি ডিক্রি জারি করেছিলেন। যুদ্ধে পাঠানোর আশঙ্কায় তখন হাজার হাজার রুশ নাগরিক প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যান। প্রায় দুই মাস পর ওই সেনা সমাবেশ কার্যত শেষ হয়।
এরপর থেকে কারাবন্দিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে রাশিয়া সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা পূরণ করে আসছে। তবে এখন সম্ভাব্য নিয়োগের উৎসও কমে আসছে।
স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম আইস্টোরিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্বেচ্ছায় সামরিক চুক্তিতে সই করা মানুষের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে যায়। এসব নিয়োগে সমাজের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের সংখ্যাই বেশি।
লিবারভ বলেন, ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত হওয়া এবং রুশ অর্থনীতির অবনতির কারণে পুতিনের জন্য এই যুদ্ধে যোগ দিতে মানুষের আগ্রহ কমছে।
রাশিয়া সরকারিভাবে সেনা নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাবে, ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে রাশিয়ার প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার সেনা নিহত হয়েছেন।
এদিকে ২০২২ সালের সেনা সমাবেশের ডিক্রি এখনো বহাল রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতিও প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার গভীর অভ্যন্তরে হামলা চালানোয় যুদ্ধের প্রভাব দেশটির ভেতরেও ক্রমশ অনুভূত হচ্ছে।
দক্ষ সেনার সংকটে রাশিয়া
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে দাবি করেছিলেন, ক্রেমলিন গোপনে ব্যাপক সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাশিয়ার স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এমন দাবির সমর্থন পাওয়া গেছে।
জুনে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির আইনপ্রণেতা আন্দ্রেই গুরুলেভ টেলিগ্রামে লিখেছিলেন, নতুন করে বড় আকারের সেনা সমাবেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাশিয়ার বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
তবে নতুন করে বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়োগ করা ব্যয়বহুল। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে দেশটির বাজেটও সংকুচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নতুন সেনা নিয়োগ করলেও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের ঘাটতি থেকেই যাবে।
ওলেগ ইগনাতভ বলেন, রাশিয়ার বর্তমান সমস্যা সেনাসংখ্যার চেয়ে সেনাদের দক্ষতা নিয়ে বেশি। আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ সেনার প্রয়োজন রাশিয়ার। এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়া আরও বেশি সমস্যায় রয়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচ