কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ আরও বাড়াতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এমন হুমকি দিয়েছেন অন্টারিওর প্রাদেশিক প্রধান ডগ ফোর্ড। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সম্প্রতি কানাডার গাড়ি, ট্রাক, অটো যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা।
এ ছাড়া প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর গত শনিবার পৃথক ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ফোর্ড সোমবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দেন।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ডগ ফোর্ড বলেন, ‘সবকিছুই বিবেচনার মধ্যে আছে। যা করা দরকার, আমি তাই করব।’ তিনি আরও বলেন, অন্টারিও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে, এমনকি রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে।
ফোর্ড জানান, তারা প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন। তাই কানাডার উৎপাদন খাত ধ্বংসের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাইলে ট্রাম্পের উচিত ব্যাটারি সঙ্গে রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিদেশি দেশগুলোর মধ্যে কানাডাই সবচেয়ে বড়। তবে পুরো দেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কানাডার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের’ তথ্য অনুযায়ী গত বছর কানাডা থেকে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় প্রায় ১৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ রফতানি করেছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে অন্টারিওর প্রাদেশিক প্রধানকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে ‘কানাডার নেতাদের লাইনে আসার’ জন্য সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, কেউ দয়া করে এই ‘ভাঁড়গুলোকে লাইনে আসতে’ বলুন। তা না হলে কানাডার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।
পোস্টে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে আবারও ‘গভর্নর’ হিসেবে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড়, ধনী ও শক্তিশালী। তাদেরকে ছাড়া কানাডা টিকে থাকতে পারবে না।
এদিকে চীনের ব্যাংকগুলোর তুলনায় কানাডার হকি স্টিক প্রস্তুতকারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে ট্রাম্প প্রশাসন খুব বেশি সতর্কতার আশ্রয় নেয়নি। তবে দুই দেশের এই উত্তেজনা বাণিজ্যকে ছাড়িয়ে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। সেটি হলো- প্রতিবেশী দেশটিকে বারবার অঙ্গরাজ্য হিসেবে উল্লেখ করা।
অন্টারিও প্রদেশের উইন্ডসর শহরের মেয়র ড্রু ডিলকিন্স বলছেন, ট্রাম্প কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাতে চেয়েছেন। এ ধরনের কথা একবার বললে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু বারবার বললে, তা সমস্যায় পরিণত হয়।
সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে কানাডায় বিক্রি হওয়া পণ্যের মোড়কে ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি ভাষাও ব্যবহার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য এটি মেনে চলা কিছুটা ঝামেলার। অটোয়া জানিয়েছে, তাদের সংবিধান দ্বৈতভাষার নিশ্চয়তা রক্ষা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটিকে দুর্বলের চেষ্টা করেছিল। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেন।
মার্ক কার্নি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তৃতীয় দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য চুক্তি সীমিত করারও চেষ্টা করেছিল ওয়াশিংটন। গত শনিবার তিনি বলেন, ‘অন্য কাউকে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দেব না।’ অর্থনীতির আকারে তুলনামূলক ছোট হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে কানাডাই বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটি মার্কিন শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শুল্কযুদ্ধ প্রতিবেশী দুই দেশের গাড়ি শিল্পে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কানাডীয়রা পণ্য বয়কট অব্যাহত রাখলে সেটির প্রভাব পড়বে মিশিগান ও মেইনের মতো অঙ্গরাজ্যে। পরবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে এসব অঙ্গরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও সামনে এনেছেন। সেটি হলো- কোনো বৈরী শক্তিশালী দেশ যখন সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি মোকাবিলায় মানুষ যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি