হিউম্যানয়েড রোবটের বাইরেও চীনে চলছে নীরব যন্ত্র বিপ্লব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

চীনে রোবটের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবটের কথাই সামনে আসে। তবে এর আড়ালে দেশটির কারখানা

2026-08-25T15:02:08+00:00
2026-08-25T15:02:08+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হিউম্যানয়েড রোবটের বাইরেও চীনে চলছে নীরব যন্ত্র বিপ্লব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০২ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
চীনে রোবটের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবটের কথাই সামনে আসে। তবে এর আড়ালে দেশটির কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও বড় এক নীরব বিপ্লব চলছে— শিল্প উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপে দ্রুত ঢুকে পড়ছে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি।

চীনের হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ২৮ বছর বয়সী চেন তিয়ানইউ প্রযুক্তির এই পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখছেন। অবসর সময়ে তিনি এমন কারখানাগুলো ঘুরে দেখেন, যেখানে উৎপাদনব্যবস্থা দ্রুত স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। পরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগান শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস শেখাতে।

তার শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী রোবটের জন্য কোড লিখছে। কেউ শিল্প রোবটের প্রোগ্রাম তৈরি করছে, কেউ আবার চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য রোবোটিক যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। চেনের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসের যুগে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে।

চীনের শিল্প খাতে এই পরিবর্তনের ব্যাপকতা এরই মধ্যে স্পষ্ট। দেশটির কারখানাগুলোতে ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করছে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। বিশ্বে ব্যবহৃত শিল্প রোবটের অর্ধেকেরও বেশি এখন চীনেই তৈরি হচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর চেংদুর একটি কারখানায় একই সঙ্গে কাজ করছে মানুষ ও রোবট। প্রায় ৩০ জন মধ্যবয়সী কর্মী স্ক্রু লাগানো, ড্রিলিং ও পালিশের কাজ করছেন। তারা তৈরি করছেন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবোটিক বাহু। পাশেই কয়েকজন তরুণ প্রকৌশলী কাজ করছেন নতুন একটি রোবটের প্রোটোটাইপ নিয়ে। তাদের লক্ষ্য, এমন রোবট তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে অন্য রোবট তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।

কারখানাটির গবেষণা ও উন্নয়ন দলের সদস্য ৩১ বছর বয়সী পাং কাই জানান, নতুন রোবটটি এখনো খুব সাধারণ কিছু কাজ করতে পারে। যেমন— কিউআর কোড শনাক্ত করা। তবে ধীরে ধীরে এর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

কারখানাটিতে প্রায় ৩০০ কর্মী কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি গত নয় বছর ধরে বিভিন্ন শিল্পের জন্য রোবোটিক বাহু তৈরি করছে। এসব বাহু গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য কিংবা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। একটি রোবোটিক বাহুকে ৯০ শতাংশের বেশি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য প্রোগ্রাম করা সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

পাং কাইয়ের আশা, একদিন রোবট মানুষের মতো নিজে নিজে চিন্তা করতে পারবে। তার মতে, চীনে ভবিষ্যতে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সেই ঘাটতি পূরণে রোবট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চীনে জনসংখ্যা কমে আসা এবং কর্মজীবী মানুষের বয়স বাড়তে থাকাও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের ওপরে হবে। আগামী এক দশকে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৬ কোটি কমে যেতে পারে বলেও কিছু পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন খাতে শ্রমিকের সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে দেখছে বেইজিং। তবে পরিবর্তনের গতি নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। চীনের উৎপাদন খাতে এখনো প্রায় ১২ কোটি মানুষ কাজ করেন। কারখানায় দ্রুত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিপমোটরের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাও লি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে যন্ত্র টানা ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারে— যা মানুষের তুলনায় বড় সুবিধা। তবে যন্ত্রেরও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।

হাংঝৌয়ের লিপমোটর কারখানায় গাড়ি তৈরির প্রায় প্রতিটি ধাপেই রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে উৎপাদন শেষে গাড়িগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষা এখনো মানুষই করছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে।

কাও লি বলেন, স্ট্যাম্পিং, ওয়েল্ডিং ও পেইন্টিংয়ের মতো বিভাগে প্রায় ১০০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়তা অর্জন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব কাজে মানুষের প্রয়োজন থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের বড় সুবিধা হলো দেশটির বিশাল উৎপাদনভিত্তি। মোটর, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, গিয়ার, সেন্সরসহ রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপকরণই দেশটির বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহজে পাওয়া যায়।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের মহাসচিব সুসানে বিলার বলেন, চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের পরিকল্পনা ও শিল্প অবকাঠামো। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সংগ্রহ করা সম্ভব।

তবে রোবটের ‘শরীর’ তৈরিতে চীন এগিয়ে থাকলেও এর ‘মস্তিষ্ক’ তৈরিতে এখনো যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ রোবট নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব রয়েছে।

তবে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে। ডিপসিক ও মুনশটের মতো প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করছে, যেগুলো শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল সবচেয়ে শক্তিশালী— তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং সেই বুদ্ধিমত্তাকে কে সবচেয়ে দ্রুত কোটি কোটি যন্ত্রের মধ্যে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই হতে পারে পরবর্তী বড় লড়াই।

রোবোটিকসের এই বিপ্লবের জন্য নতুন প্রজন্মের কর্মী তৈরিতেও জোর দিচ্ছে চীন। হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউটে ১৫ বছর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটিতে ইঞ্জিন ও উড়োজাহাজ প্রযুক্তির জন্য আলাদা ভবন রয়েছে। এমনকি বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি শেখানোর জন্যও রয়েছে বিশেষায়িত বিভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় বিরল মৃত্তিকা চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্বের হার কমাতেও এ ধরনের কারিগরি শিক্ষাকে কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষক চেন তিয়ানইউ বলেন, তার শিক্ষার্থীদের চাহিদা এত বেশি যে অনেককে কোম্পানিগুলো আগে থেকেই নিয়োগের জন্য বুক করে রাখে।

তার মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তন থামবে না। তাই সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকার বদলে এর মধ্যেই নিজের অবস্থান তৈরি করতে হবে।

তবে রোবট বিপ্লব চীনের সব অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দেশটি দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকট, স্থানীয় সরকারের বিপুল ঋণ এবং দুর্বল ভোগব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব শেষ পর্যন্ত চীনের মানুষের জন্য কতটা সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। নাকি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানই কেড়ে নেবে— তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

চেন তিয়ানইউ বলেন, ভবিষ্যতে কী হবে, সে বিষয়ে তিনিও নিশ্চিত নন। তবে প্রযুক্তির পরিবর্তন এত দ্রুত হচ্ছে যে স্থির হয়ে থাকার সুযোগ নেই। সামনে এগিয়ে গেলেই বোঝা যাবে, মানুষ আসলে কতদূর যেতে পারে।


সময়ের আলো/কেএইচ


  বিষয়:   সময়ের আলো  চীন  হিউম্যানয়েড রোবট 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: