ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখনই তেহরানের ওপর আরও কঠিন অর্থনৈতিক চাপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। একদিকে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা, অন্যদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞা, দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছে ইরান। এর প্রভাব শুধু দেশটির সরকারের ওপর নয়, সরাসরি পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
মার্কিন প্রশাসন ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে নতুন এক দফা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের ঘোষণায় এসব পদক্ষেপের বিস্তারিত আসার কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই অর্থনৈতিক চাপকে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু ইরান নয়, দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা বিভিন্ন ব্যাংক, তেল ক্রেতা, জাহাজ কোম্পানি, বন্দর, শিপিং প্রতিষ্ঠান এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানও পড়তে পারে। অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলেও অন্য দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের নিজস্ব কৌশল
২০১৮ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি চালিয়ে আসছে। এত বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকতে থাকতে ইরানও সেগুলো পাশ কাটানোর নানা ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
তেল পরিবহনে গোপন নৌবহর ব্যবহার, এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল স্থানান্তর, বিভিন্ন কোম্পানির আড়ালে ব্যবসা এবং বিকল্প পদ্ধতিতে লেনদেন, এসব কৌশল ব্যবহার করে আসছে তেহরান।
তবে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারলেও এর ক্ষতি থেকে পুরোপুরি বাঁচতে পারছে না দেশটি।
এরই মধ্যে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। তেহরানের খোলা বাজারে এক ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়ালেরও বেশি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা টাকার মূল্য কমছে, বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ।
যুদ্ধের উত্তেজনাও বাড়ছে
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও বাড়ছে। ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোরভাবে সতর্ক করছেন।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগর দিয়ে ইরান এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি করতে দেবে না।
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামিও বলেছেন, প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের বাহিনী প্রস্তুত। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে হলে শক্তির ভাষায় জবাব দিতে হবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। সেখানে কোনো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে শুধু ইরান নয়, বিশ্ববাজারেও তেলের দাম ও সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পক্ষেও কথা বলেছেন। তার মতে, শক্ত অবস্থানে থেকেই এখন যুদ্ধের অবসান ঘটানো ভালো।
চীনই বড় ভরসা
নতুন নিষেধাজ্ঞা সামলাতে ইরানের সবচেয়ে বড় ভরসা চীন। চীন ইরানের বিপুল পরিমাণ তেল কিনে থাকে। রাশিয়া এবং আরও কিছু দেশের সঙ্গেও ইরানের বাণিজ্য রয়েছে।
এ ছাড়া ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান।
কিন্তু এসব ব্যবস্থা ইরানের তেল বিক্রি থেকে হারানো পুরো আয় পূরণ করতে পারছে না।
চীন রাজনৈতিকভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করলেও দেশটির বড় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিতে চায় না। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যেতে বেশি আগ্রহী।
শেষ পর্যন্ত ভুগবে সাধারণ মানুষই
সব মিলিয়ে ইরান এখন একসঙ্গে দুই ধরনের চাপের মধ্যে আছে, একদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
চীন ও অন্য কয়েকটি দেশের সহায়তায় ইরান হয়তো কিছুটা সময় এই চাপ সামলাতে পারবে। কিন্তু মুদ্রার পতন, মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট এবং কমে যাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দেখিয়ে দিচ্ছে, এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষকেই।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ