যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই মধ্যস্থতার চেষ্টা জোরদার করেছে পাকিস্তান। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সোমবার তেহরানে গিয়ে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে।
পাকিস্তানের দাবি, এক দিনের এই সফরে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে ইরানের সামরিক নেতৃত্বকে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে আসিম মুনির কতটা সফল হবেন, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইরানের ভেতরেই মতের পার্থক্য
সফরের আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, ইরান শক্ত অবস্থানে থাকা অবস্থাতেই যুদ্ধের অবসান ঘটানো উচিত। কিন্তু দেশটির সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভুল করলে তার জবাব হবে কঠোর ও ধ্বংসাত্মক।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং আলোচনায় ফেরার বিষয়ে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আসিম মুনিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোর একটি ছিল জেনারেল মোহসিন রেজায়ীর সঙ্গে। রেজায়ী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতিনিধি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব। সামরিক বাহিনী ও সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে তাকে দেখা হয়।
কেন মুনিরকে এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
ইরানের যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বর্তমানে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিরাপত্তা কাঠামোর প্রভাব অনেক বেশি। তাই কূটনীতিকের চেয়ে একজন সামরিক কর্মকর্তাই হয়তো ইরানের জেনারেলদের সঙ্গে বেশি কার্যকরভাবে কথা বলতে পারবেন, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি এর আগে একাধিকবার তেহরান সফর করলেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসিম মুনিরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। তিনি রাজনীতিবিদ নন, একজন সামরিক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
মুনিরের তেহরান সফরের কয়েক দিন আগে ট্রাম্প নিজেই তাকে ফোন করেছিলেন বলে জানা গেছে। ওই ফোনে পাকিস্তানকে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে প্রভাব কাজে লাগানোর অনুরোধ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের বার্তা অবশ্য আগের মতোই
তেহরানে বৈঠকের পর ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
রেজাই মুনিরকে বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং ওয়াশিংটনকে তার আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।
গালিবাফ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, সমঝোতা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে এবং আগের সমঝোতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি ওয়াশিংটনকে মানতে হবে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও মুনিরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভাষা ও আচরণ পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন। তার মতে, শক্তি প্রদর্শন ও হুমকি দিয়ে পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ পাকিস্তান অগ্রগতির কথা বললেও ইরানের প্রকাশ্য অবস্থানে এখনো বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও আলাদা আলোচনা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হরমুজ প্রণালি। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। তাই যুদ্ধের পাশাপাশি প্রণালিটি কীভাবে চালু রাখা যায়, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে পাকিস্তানের পাশাপাশি ওমানও মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি তেহরানে গিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলাদা আলোচনা করার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও ওমানের উদ্যোগ একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা নিয়ে ইরান-ওমানের কোনো সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
আসল ক্ষমতা কার হাতে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রেসিডেন্ট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো চুক্তিতে সম্মত হলেও সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের সমর্থন প্রয়োজন।
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, পেজেশকিয়ান ও গালিবাফ মনে করছেন ইরান এভাবে অনির্দিষ্টকাল চলতে পারবে না। অন্যদিকে আইআরজিসির একটি অংশ মনে করছে, সময় বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষেই যাচ্ছে।
এ কারণে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে মোহসেন রেজাই, আহমাদ ওয়াহিদি এবং আইআরজিসি, যুদ্ধ শেষ করার যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, সেটি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আসিম মুনির এখন এমন এক কঠিন মিশনে রয়েছেন, যেখানে তাকে শুধু ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, দেশটির শক্তিশালী সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকেও বোঝাতে হবে। ইরানি জেনারেলদের যুদ্ধের ময়দান থেকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারাই হবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ