আট দশকের ইতিহাসে জাতিসংঘের মহাসচিবের পদে এখন পর্যন্ত কোনো নারী বসেননি। তবে ২০২৬ সালের মহাসচিব নির্বাচন সেই দীর্ঘ ইতিহাস বদলে দিতে পারে। আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এরপর নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন ২০২৭ সালের শুরুতে। এবার প্রার্থীদের তালিকায় পাঁচ নারী রয়েছেন, যা জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান (কোস্টারিকা)
কোস্টারিকার সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এর আগে তিনি কোস্টারিকার অর্থমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে তথ্য, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। প্রথম নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটে ১০টি ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ ভোট পেয়ে তিনি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনায় তিনি এক পরিচিত নাম।
ক্যারোলিন রডরিগেজ-বিরকেট (গায়ানা)
গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমানে জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারোলিন রডরিগেজ-বিরকেটের প্রার্থিতা বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি বর্তমানে জাতিসংঘে গায়ানার রাষ্ট্রদূত। একটি আদিবাসী গ্রামে জন্ম নিয়ে শিক্ষকতা থেকে কূটনীতিতে উঠে আসা তার জীবনকাহিনি অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর হয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু অর্থায়ন ও উন্নয়ন ইস্যুতে তার জোরালো অবস্থান রয়েছে। প্রথম স্ট্র পোলেও তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। নির্বাচিত হলে তিনি শুধু প্রথম নারী মহাসচিবই নন, প্রথম ক্যারিবীয় মহাসচিবও হবেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে গায়ানা তথা ক্যারিবীয় দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার কূটনৈতিক দক্ষতা বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত। দক্ষিণ বিশ্বের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।
মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা (ইকুয়েডর)
মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা গারসেস আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পরিচিত মুখ। ইকুয়েডরের সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে একজন দক্ষ কারিগর। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করে জাতিসংঘকে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কার্যকর করার ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার প্রার্থিতা জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃত্বে ল্যাটিন আমেরিকার নারীদের দীর্ঘদিনের উপস্থিতির ধারাবাহিকতাও তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনের প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হয়ে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও বৈশ্বিক জলবায়ু বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার সক্রিয় নেতৃত্ব পরিবেশ সচেতন বিশ্বনেতাদের সমর্থন পাচ্ছে।
মিশেল ব্যাশেলে (চিলি)
ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতির অন্যতম কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব মিশেল ব্যাশেলে। চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলে এই দৌড়ের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও তার অবদান স্মরণীয়। এ ছাড়াও জাতিসংঘ নারী সংস্থার সূচনাপর্বের নেতৃত্বের ভার ছিল তারই কাঁধে। মানবাধিকার রক্ষা ও বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে তার আপোসহীন ভাবমূর্তি তাকে অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রার্থী করে তুলেছে। জাতিসংঘকে আরও দক্ষ ও মানুষের কাছে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে তিনি। চিলি তার প্রার্থিতা থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করলেও ব্রাজিল ও মেক্সিকোর যৌথ সমর্থনে তার প্রার্থিতা তালিকায় রয়েছে।
ইভোনে বাকি (ইকুয়েডর)
কূটনৈতিক অঙ্গনে ‘সংলাপ ও শান্তির দূত’ হিসেবে পরিচিত ইভোনে বাকি। ১৭ আগস্ট তার মনোনয়ন জমা পড়েছে। দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে তিনি একাধিক দেশে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশটির মন্ত্রীও ছিলেন। লেবাননের গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার শান্তি ও সংঘাত প্রতিরোধের ভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। জাতিসংঘ সংস্কার, সংঘাত প্রতিরোধ এবং সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই দূরদর্শী নারী শান্তি আলোচনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে অনন্য অবদান রেখে আসছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন কেবল জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা নয়। নিরাপত্তা পরিষদ প্রার্থী বাছাই করে সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করবে, আর চূড়ান্ত নিয়োগ দেবে সাধারণ পরিষদ। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতাও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
তবু এবারের প্রতিযোগিতা ঐতিহাসিক। পাঁচ নারী প্রার্থীর উপস্থিতি দেখাচ্ছে, বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্বের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। তাদের কেউ নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহাসচিবের চেয়ারে বসবেন একজন নারী। সেই মুহূর্ত শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য হবে না বরং বিশ্ব নেতৃত্বে নারীর দীর্ঘ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি