প্রতিকূল আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা, প্রবল স্রোত কিংবা জলসীমা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞানের স্বল্পতায় মাছ ধরতে গিয়ে দেশের সমুদ্রসীমা পেরিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ছেন বাংলাদেশি জেলেরা। আর সীমান্ত অতিক্রম করলেই অনেকের জীবনে নেমে আসছে অন্ধকার। ভারত ও মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশের অভিযোগে বাংলাদেশি জেলেদের আটক করা হচ্ছে। আবার কখনো বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকেও অস্ত্রের মুখে জেলেদের জিম্মি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। ফলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া এখন এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে এ ধরনের খবর।
সূত্রমতে, গত দেড় বছরে এই দুই দেশের জলসীমা থেকে সাত শতাধিক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। তবে তাদের বড় একটি অংশকে ফেরত আনা গেলেও এখনও কিছু জেলে আটকে রয়েছেন। এ ছাড়া কোনো কোনো জেলের খোঁজ নেই বছরের পর বছর। এমন ঘটনায় নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছে সমুদ্রতীরবর্তী জেলে পরিবারগুলো। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তাবেষ্টনী নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের হাতে ৩২০ জন বাংলাদেশি জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আটক করেছে আরও ৩২৯ জনকে। এই সময়ে ৬৭০ জেলেকে উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড। তাদের মধ্যে এই সময়ের আগে অপহৃত ও আটক জেলেও রয়েছেন। তবে এখনও বেশ কিছু জেলের খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই নিখোঁজ জেলেরা কারও বাবা, স্বামী, ভাই কিংবা সন্তান। বছরের পর বছর স্বজনের অপেক্ষায় থাকা তাদের পরিবারের অনেকে নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের আর্তনাদ ভেসে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে। সমুদ্রে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জেলেরা ঠিক কী কারণে বেশি মাত্রায় অপহরণের ঘটনার শিকার হচ্ছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে কোস্ট গার্ড জানায়, অধিকাংশ জেলের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখা (আইএমবিএল) এবং এ সংক্রান্ত আইন, বিধিবিধান ও সীমারেখা অতিক্রমের ফলে সম্ভাব্য আইনি শাস্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব রয়েছে।
এ ছাড়া মাছ আহরণের সময় সীমান্তবর্তী এলাকায় অনিচ্ছাকৃতভাবে অথবা অধিক লাভের আশায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখা অতিক্রম করা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা, জোয়ার-ভাটা, প্রবল স্রোত ও বাতাস কিংবা ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কারণে নৌকার গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভারত ও মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশ করে ফেলে জেলেরা। একই সঙ্গে অধিকাংশ মাছ ধরার নৌকায় আধুনিক নেভিগেশন ও অবস্থান নির্ণয়কারী যন্ত্র গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ও অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (আইএআইএস) না থাকা কিংবা যথাযথভাবে ব্যবহার না করার কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি।
এদিকে অপহরণের শিকার একাধিক জেলে ও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাছ ধরতে গিয়ে অসাবধানতাবশত কোনো নৌকা যদি একটুখানিও মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তে প্রবেশ করে তাতেই তাদের আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া কখনো কখনো বাংলাদেশের সীমান্তে এসেও অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলেদের। প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, জেলেদের আটকের পর অনেক সময় তাদের কাছে বাংলাদেশের সীমানায় থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান আরাকান আর্মির সদস্যরা। আর এসব তথ্য না দিলেই মারধর করা হয় জেলেদের। এ ছাড়া আরাকান আর্মির হাতে জেলেদের আটকের পেছনে তাদের খাদ্যসামগ্রী লুট করে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
জেলেদের ভাষ্যমতে, জেলেদের নৌকা আটকের পর লাখ লাখ টাকার মাছ, জাল, খাবার ও অন্য সরঞ্জাম দখল করে নেয় আরাকান আর্মির সদস্যরা। তারা তাদের সরকারের কাছ থেকে কোনো খাবার না পাওয়ায় বাংলাদেশি জেলেদের ধরে এসব নিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, মিয়ানমারের সামরিক সরকার বিদ্রোহীদের কাছ থেকে আরাকানের দখল নিতে চেষ্টা করছে। নৌপথে সরকারি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় নদী ও সাগরে কড়া নজরদারি করছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। বাংলাদেশি জেলে অপহরণের পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ।
এদিকে অপহরণের ঘটনা রোধে কী ভূমিকা রাখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে কোস্ট গার্ড এক লিখিত বক্তব্যে সময়ের আলোকে জানায়, ভারতীয় ও মিয়ানমার জলসীমায় বাংলাদেশি জেলেদের আটক প্রতিরোধে নিয়মিত টহল, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখা সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, নিরাপদ এলাকায় মাছ আহরণের নির্দেশনা এবং জেলে, বোট মালিক ও মৎস্য অধিদফতরের সমন্বয়ে আলোচনা সভা পরিচালনা করে আসছে।
এ ছাড়া কোনো বাংলাদেশি জেলে আটক হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আরাকান আর্মির হাতে আটক জেলেদের প্রত্যাবর্তনে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলেও জানায় সংস্থাটি।
এদিকে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ও ভারত কর্তৃপক্ষের দ্বারা অপহরণ কিংবা আটকের ঘটনাকে একদৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। আরাকান আর্মির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিরোধমূলক নজরদারি ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাধান করার কথা জানিয়েছে তারা।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির সময়ের আলোকে বলেন, গত দেড় বছরে ৬৪৯ জন জেলে অপহরণ বা আটকের শিকার হওয়ার তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি আলাদাভাবে দেখা জরুরি। আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে জেলেদের জিম্মি বা জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া এবং ভারতের জলসীমায় প্রবেশের অভিযোগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আটক, দুটি বিষয়কে একইভাবে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, আরাকান আর্মির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিরোধমূলক নজরদারি ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা। শুধু অপহরণের পর আলোচনা করে জেলেদের ফিরিয়ে আনা নয়, কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি তা চিহ্নিত করে আগাম সতর্কতা দিতে হবে স্থানীয়দের।
অন্যদিকে ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাধান করা দরকার। অনিচ্ছাকৃতভাবে জলসীমা অতিক্রমকারী জেলেদের দ্রুত শনাক্ত ও প্রত্যাবাসনের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা থাকতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অতীতেও পারস্পরিকভাবে জেলে প্রত্যাবাসন হয়েছে, এ ধরনের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও নিয়মিত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া জেলেদের সচেতনতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই কর্মী। তিনি বলেন, সমুদ্রসীমা, সীমান্ত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং জরুরি যোগাযোগ সম্পর্কে জেলেদের নিয়মিত অবহিত করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দিতে হবে। এ ছাড়া ছোট নৌযানগুলোতেও সাশ্রয়ী ট্র্যাকিং ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, আমাদের এখন ঘটনার পর উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার আগে প্রতিরোধের দিকে যেতে হবে। ৬৪৯ জন জেলের তথ্য শুধু একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত পরিবারের নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জেলে সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ঝুঁকি টেকসইভাবে কমানো সম্ভব হবে না।