কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে দুদক

সমীরণ রায়

জাতীয়

দীর্ঘ ১৬৬ দিনের নেতৃত্বশূন্যতার অবসান ঘটিয়ে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফিরেছে গতি।

2026-08-29T06:01:47+00:00
2026-08-29T06:01:47+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে দুদক
সমীরণ রায়
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০১ এএম 
দুর্নীতি দমন কমিশন। ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৬৬ দিনের নেতৃত্বশূন্যতার অবসান ঘটিয়ে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফিরেছে  গতি। দুদকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়ে। গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার অভিযোগের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২টি অভিযোগ এনফোর্সমেন্ট বা অনুসন্ধানের জন্য বাছাই করা হয়। ফলে নতুন কমিশনের জন্য শুধু মামলা নেওয়া নয়, অভিযোগ বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনাই প্রধান চ্যালেঞ্জ সংস্থাটির। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ পড়ছে কি না। 

কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ অগ্রাধিকার হারাচ্ছে কি না, এ বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে নতুন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছেন সাবেক সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। 

যদিও গত ৩ মার্চ আগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. হাফিজ আহসান ফরিদ একযোগে পদত্যাগ করেন। ফলে দুদকের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ায় ঝুলে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গতি ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অবশ্য, নতুন কমিশনের প্রথম দিনের কার্যক্রমেই অনেকটা প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা গেছে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ফাইল, অনুসন্ধান ও তদন্ত দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যানসহ পুরো কমিশন। কমিশন জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার অবস্থান নয়, দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়বস্তু ও প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

অবশ্য, নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানও দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেন, বর্তমান কমিশন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা মদদপুষ্ট হয়ে এই দায়িত্বে আসেনি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কমিশন সর্বাত্মক চেষ্টা করবে এবং সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা ও পেশাদারির সঙ্গে কাজ করবে। 

এমনকি তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে চলমান সব ফাইল চেয়েছেন। তিনি কোন ফাইল কার বিরুদ্ধে তা বিবেচনায় না নিতেও নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ব্যক্তি হিসেবে নয়, জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছেন।

এদিকে কমিশনশূন্য সময়ে দুদকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চললেও কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে রয়েছে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ঝুলে থাকা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, চলমান অনুসন্ধান ও তদন্তের অগ্রগতি, আদালতে বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ মামলা এবং প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়গুলো নিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছে কমিশন। 

তবে শুধু নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলেই দুদকের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান হবে না। বরং প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল সংকট, প্রসিকিউশন ব্যবস্থা, প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির মতো বিষয়গুলোতে সংস্কার আনাই হবে বড় পরীক্ষা। সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন ও গণঅভ্যুত্থানের পর, নবনিযুক্ত কমিশন এই জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে এক আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

সংস্থাটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দুদকের নতুন কমিশনের প্রথম বৈঠকে সংস্থাটির বর্তমান জনবল দ্বিগুণ করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে সংস্থার কার্যক্রম বিস্তৃত করতে ৬৪টি জেলা কার্যালয়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি মহানগর কার্যালয় এবং বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে দুটি কার্যালয়সহ মোট ৬৮টি নতুন কার্যালয়ের অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দুদকের কার্যক্রমের পরিধি বিবেচনায় উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ সংস্থাটির পক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুর্নীতির অভিযোগ এলেও সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর কারণে সব অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই করা কঠিন পড়ে। ফলে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে জেলা পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়াবে। এ ছাড়া দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগও নতুন কমিশনের রোডম্যাপে রয়েছে। 

অনুসন্ধান থেকে প্রসিকিউশন পর্যন্ত কাজকে ‘ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা আইপিএমএসের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শেষে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহারও হয়েছিল, যদিও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। এর পাশাপাশি পুলিশের আদলে ‘ক্রিমিনাল ডেটা বেইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা সিডিএমএস চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে অভিযোগ, অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলার তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হলে তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করার নজির স্থাপন করাই নতুন কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় পর পূর্ণ কমিশন ফিরে আসায় দুদকে নতুন কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। 

জনবল বাড়ানো, নতুন কার্যালয়, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট, অর্থপাচার রোধ এবং অভ্যন্তরীণ শুদ্ধিসব মিলিয়ে একটি বড় সংস্কারের রূপরেখা সামনে এসেছে। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন এক নয়। 

নতুন কমিশনের আসল সাফল্য নির্ভর করবে তারা কতটা স্বাধীনভাবে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে তার ওপর। দুদকের জন্য তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নতুন রোডম্যাপ কি সত্যিই প্রতিষ্ঠানটিকে নখ-দন্তহীন অবস্থার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারবে। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   স্বচ্ছতা  দুদক  টিআইবি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: