খুলনার পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজি-সহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বিশেষ করে টানা বৃষ্টি, সরবরাহে বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মৌসুমি উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারেও পড়েছে।
খুলনা ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং অযৌক্তিক মুনাফা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে দ্রব্যমূল্য কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সংগ্রহ ও দ্রুত বাজারজাত নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে। বাজারের এমন চড়া পরিস্থিতির কারণে নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষ চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন।
বিক্রেতারা বলছেন যে পাইকারি বাজারে দাম কমা না পর্যন্ত খুচরা বাজারে দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এতে সীমিত আয়ের মানুষ, দিনমজুর ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক ক্রেতা জানান, আগের তুলনায় একই টাকায় এখন অনেক কম পরিমাণ বাজার করতে হচ্ছে।
খুলনার বাজারে সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আকাশচুম্বী দামে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে খুলনাঞ্চলের সাধারণ ক্রেতা ও সুশীল সমাজের মানুষ সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন।
মূল্য তালিকা বাধ্যতামূলক প্রতিটি খুচরা ও পাইকারি দোকানে দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ পণ্যের মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখা নিশ্চিত করা। পাইকারি বাজার ও খুচরা বাজারের পণ্যের দামের মধ্যে তফাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া, যাতে খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত মুনাফা না করতে পারে। প্রান্তিক কৃষকরা যাতে খুলনা শহরের পাইকারি বাজারে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা হয়রানি ছাড়াই সরাসরি নিজেদের সবজি বিক্রি করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা। মহাসড়ক ও ঘাটে পণ্যবাহী যানবাহনে সব ধরনের অবৈধ চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা। মধ্যস্বত্বভোগী ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। খুলনা নগরী ও উপজেলা পর্যায়ে ওএমএস এবং টিসিবি এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রির ট্রাকের সংখ্যা এবং পণ্যের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা, যাতে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের কারসাজি রুখতে খুলনার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও আড়তে প্রতিদিন বা একদিন অন্তর জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযান চালাতে হবে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে খুলনার বড়বাজার, ময়লাপোতা সন্ধ্যা বাজার, রয়েল মোড়, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, চিত্রালী, চিত্রালি বাজার, দৌলতপুর বাজার, মহেশ্বর পাশা কালীবাড়ি, বয়রা বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির বাজারে পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি, বেগুন ৬০ থেকে ৪০, করলা ৫০ থেকে ১০০, কুমড়া প্রতিটি ৫০ থেকে ৬০, লাউ প্রতিটি আকারভেদে ৫০ থেকে ৬০, পটল ৬০, কচুর লতি ৪০ থেকে ৫০ এবং ধুন্দল ৪০ থেকে ৫০, কাঁচা মরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পেঁয়াজের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি, বড় রসুনের কেজি ১০০ থেকে ১২০ এবং আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি। মাছের বাজারে ছোট ইলিশ ৭০০ থেকে ৮০০, একটু বড় ইলিশ কেজি ১৬০০, থেকে ২২০০, টাকা, চিংড়ি ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি, রুই আকারভেদে ২৬০, থেকে ২৮০, টাকা কেজি, ভেটকি মাছ আকারভেদে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, ট্যাংরা মাছ ৬০০, থেকে ৭০০, টাকা পাবদা মাছ ৩৫০, থেকে ৪০০, তেলাপিয়া ২০০, পাঙাশ ২০০, থেকে ২২০, কাতল ২৪০ থেকে ২৫০ এবং ছোট মাছ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি, সোনালি ২৩০ থেকে ২৪০ ও লেয়ার ২৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে গরুর মাংস ৭৫০ এবং খাসির মাংস ১১৫০ টাকা কেজি বিক্রি-সহ অধিকাংশ সবজির দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তে বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সাম্প্রতি খুলনার বাজারে মাছ-মাংস ও অধিকাংশ সবজির দাম এক সপ্তাহে আরও বেড়েছে।
এছাড়াও অন্যান্য বাজার, খালিশপুর চিত্রালী, আড়ংঘাটা, ফুলবাড়ি গেট, বয়রা, ময়লাপোতা সান্ধ্যবাজার, সোনাডাঙ্গা, রেলিগেট নিরালা বাজারগুলোতে এক এক জায়গায় এক এক রকম ১৫-২০ টাকার পার্থক্য রয়েছে।
চিত্রালী বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আলামিন বলেন, সবজির দাম এই মৌসুমে অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আড়ংঘাটা বাজারে ক্রেতা সরকারি চাকরিজীবী সৌরভ আহমেদ বলেন, পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারের প্রতিটি পণ্যের দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০-২৫ টাকা বেশি।
খালিশপুর নিউমার্কেট বাজারে সবজি ব্যবসায়ী ফিরোজ বলেন, পাইকারি বাজার থেকে বেশিতে কিনতে হয়। তাই বেশিতে বিক্রি করতে হয়। বাজারে করতে আসা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বড় বাজার থেকে বাজার করি। খুচরা বাজারের চেয়ে এখানে দাম বেশি একটা কম নয়।
খুলনা জাতীয় ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তা ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ ক্রেতারা যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অসাধু বা অতিমুনাফাভোগী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন, তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া আরও সহজ ও শক্তিশালী হবে।
সময়ের আলো/জোই