ফুটবলে দলবদল কীভাবে হয়, কোটি কোটি টাকা যায় কোথায়

খেলা

ফুটবলের মাঠে ৯০ মিনিটের লড়াই যতটা দৃশ্যমান, মাঠের বাইরে একজন খেলোয়াড়কে এক ক্লাব থেকে অন্য ক্লাবে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ততটাই জটিল।

2026-08-29T16:00:33+00:00
2026-08-29T16:00:33+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
খেলা
ফুটবলে দলবদল কীভাবে হয়, কোটি কোটি টাকা যায় কোথায়
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০০ পিএম 
ফুটবলে দলবদল কীভাবে হয় । ছবি : সংগৃহীত
ফুটবলের মাঠে ৯০ মিনিটের লড়াই যতটা দৃশ্যমান, মাঠের বাইরে একজন খেলোয়াড়কে এক ক্লাব থেকে অন্য ক্লাবে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ততটাই জটিল। শত শত কোটি ইউরোর চুক্তি, দীর্ঘ দর-কষাকষি, এজেন্টের আলোচনা, মেডিকেল পরীক্ষা, চুক্তির নানা শর্ত এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অনুমোদন। সব মিলিয়ে একটি দলবদল সম্পন্ন হওয়ার পেছনে কাজ করে বিশাল এক আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।

সহজ ভাষায়, ফুটবল ট্রান্সফার হলো দুই ক্লাবের মধ্যে একটি চুক্তি। কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার বর্তমান ক্লাবের চুক্তির মেয়াদ থাকলে, তাকে দলে নিতে আগ্রহী ক্লাবকে সাধারণত বর্তমান ক্লাবকে ট্রান্সফার ফি দিতে হয়। খেলোয়াড়ের মূল্য নির্ধারণে অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো সূত্র নেই। তার বয়স, বর্তমান পারফরম্যান্স, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক মূল্য এবং বর্তমান চুক্তির কতটা সময় বাকি আছে, সবকিছুই বিবেচনায় আসে।

ধরা যাক, কোনো ক্লাবের একজন খেলোয়াড়কে অন্য একটি দল খুব পছন্দ করেছে। প্রথমে আগ্রহী ক্লাব সাধারণত খেলোয়াড়ের বর্তমান ক্লাবের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়। বিক্রয়কারী ক্লাব প্রস্তাবে রাজি হলে শুরু হয় দুই ক্লাবের মধ্যে দর-কষাকষি। ট্রান্সফার ফি ও অন্যান্য শর্তে সমঝোতা হওয়ার পর আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আসে, খেলোয়াড়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত চুক্তি।

সেখানেই ঠিক হয় নতুন ক্লাবে তার বেতন কত হবে, চুক্তির মেয়াদ কত বছর হবে, সাইনিং বোনাস থাকবে কি না কিংবা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকবে কি না। অর্থাৎ দুই ক্লাবের মধ্যে ট্রান্সফার ফি নিয়ে সমঝোতা হয়ে গেলেই দলবদল সম্পূর্ণ হয়ে যায় না। খেলোয়াড়ের সম্মতিও অপরিহার্য।

এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে খেলোয়াড়ের এজেন্টের। জর্জ মেন্দেস কিংবা প্রয়াত মিনো রাইওলার মতো পরিচিত এজেন্টরা শুধু বেতন বা ট্রান্সফার বোনাস নিয়ে আলোচনা করেন না, অনেক সময় খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও বড় ভূমিকা রাখেন। নতুন ক্লাব বেছে নেওয়া থেকে শুরু করে চুক্তির শর্ত ঠিক করা, সব ক্ষেত্রেই এজেন্টের প্রভাব থাকতে পারে।

তবে দলবদলের ক্ষেত্রে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তৈরি হতে পারে বিতর্ক। খেলোয়াড়ের বর্তমান ক্লাবের অনুমতি ছাড়া তাকে গোপনে অন্য ক্লাবে যাওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টাকে ফুটবলের ভাষায় বলা হয় ‘ট্যাপিং আপ’। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। কিন্তু এটি গোপনে হওয়ায় প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেকটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘ফ্রি ট্রান্সফার’। কোনো খেলোয়াড়ের বর্তমান ক্লাবের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি কোনো ট্রান্সফার ফি ছাড়াই অন্য ক্লাবে যোগ দিতে পারেন। ১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক বোসম্যান রুলিংয়ের পর চুক্তির শেষ ছয় মাসে খেলোয়াড়দের অন্য ক্লাবের সঙ্গে আগাম আলোচনা ও প্রি-কনট্রাক্ট করার সুযোগ তৈরি হয়।

কোনো খেলোয়াড় যদি মনে করেন ক্লাব তাকে ছাড়তে চাইছে না, অথচ তিনি অন্য কোথাও যেতে চান, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রান্সফার রিকোয়েস্ট জমা দিতে পারেন। এটি মূলত ক্লাবের প্রতি নিজের অসন্তোষ প্রকাশের একটি উপায়। একই সঙ্গে অন্য ক্লাবগুলোকেও দেওয়া হয় একটি স্পষ্ট বার্তা, খেলোয়াড়টি দল ছাড়তে আগ্রহী।

দলবদলের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘রিলিজ ক্লজ’ বা ‘বাইআউট ক্লজ’। খেলোয়াড়ের চুক্তিতেই যদি নির্দিষ্ট একটি অর্থের অঙ্ক আগে থেকে ঠিক করা থাকে, সেটিই রিলিজ ক্লজ। কোনো ক্লাব সেই নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করলে কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান ক্লাবের আর খেলোয়াড়কে আটকে রাখার সুযোগ থাকে না। ফলে নতুন ক্লাবকে দীর্ঘ দর-কষাকষিতে যেতে হয় না।

তবে রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করলেই খেলোয়াড় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ক্লাবে চলে যান না। খেলোয়াড়ের নিজের সম্মতিও প্রয়োজন। নতুন ক্লাবের সঙ্গে তার বেতন, চুক্তির মেয়াদ এবং দলে ভূমিকা নিয়ে আলাদা সমঝোতা করতে হয়।

দলবদল আবার সারা বছর খোলা থাকে না। ফিফা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়েই খেলোয়াড় কেনাবেচা করা যায়। এই সময়কে বলা হয় ট্রান্সফার উইন্ডো। সাধারণত মৌসুম শেষ হওয়ার পর গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজার খোলে। আর মৌসুম চলাকালে জানুয়ারিতে থাকে ছোট একটি উইন্ডো, যেখানে দলগুলো চোট, দুর্বলতা কিংবা জরুরি প্রয়োজন অনুযায়ী স্কোয়াডে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে।

ট্রান্সফার ফি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, কোনো খেলোয়াড়কে ১০০ মিলিয়ন ইউরোতে কিনলে সেই অর্থের বড় অংশ সরাসরি খেলোয়াড়ের হাতে যায়। আসলে তা নয়। ট্রান্সফার ফি মূলত যায় খেলোয়াড়কে ছেড়ে দেওয়া ক্লাবের কাছে। খেলোয়াড় নিজে পান তার চুক্তিতে নির্ধারিত বেতন, সাইনিং বোনাস, লয়্যালটি বোনাস কিংবা পারফরম্যান্সভিত্তিক অন্যান্য অর্থ।

অর্থাৎ ১০০ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার মানেই খেলোয়াড়ের আয় ১০০ মিলিয়ন ইউরো নয়। বরং সেই অর্থ দুই ক্লাবের মধ্যকার চুক্তির অংশ। খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত আয় নির্ধারিত হয় তার নতুন চুক্তি অনুযায়ী।

ট্রান্সফার ফিও সব সময় একবারে পরিশোধ করা হয় না। বড় অঙ্কের দলবদলে অনেক সময় চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত অনুযায়ী কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করা হয়। এর সঙ্গে থাকতে পারে ‘অ্যাড-অনস’। যেমন নির্দিষ্টসংখ্যক ম্যাচ খেললে, গোল করলে কিংবা দল কোনো শিরোপা জিতলে বাড়তি অর্থ দিতে হবে।

কিছু চুক্তিতে আবার থাকে ‘সেল-অন ক্লজ’। এর অর্থ, নতুন ক্লাব ভবিষ্যতে সেই খেলোয়াড়কে অন্য কোনো দলে বিক্রি করলে আগের ক্লাবও ট্রান্সফার ফির একটি নির্দিষ্ট শতাংশ পেতে পারে। ফলে একজন খেলোয়াড়ের প্রথম দলবদলের পরও তাঁর পরবর্তী দলবদলের সঙ্গে আগের ক্লাবের আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকতে পারে।

এজেন্টরাও এই বিশাল আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের পারিশ্রমিক নির্ভর করে তারা খেলোয়াড়, ক্রয়কারী ক্লাব নাকি বিক্রয়কারী ক্লাবের হয়ে কাজ করছেন তার ওপর। সাধারণভাবে খেলোয়াড়ের বেতনের একটি অংশ কমিশন হিসেবে পাওয়ার পাশাপাশি ট্রান্সফার ফি থেকেও নির্দিষ্ট হারে অর্থ পেতে পারেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের হয়ে কাজ করা এজেন্টের কমিশন প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। আবার বিক্রয়কারী ক্লাবের হয়ে কাজ করলে ট্রান্সফার ফির প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পাওয়ার নজির রয়েছে।

তবে এই হার সব ক্ষেত্রে এক নয়। চুক্তি অনুযায়ী কমিশন কম-বেশি হতে পারে। অনেক সময় খেলোয়াড় নিজে এজেন্টের কমিশন দেন না, বরং ক্রয়কারী ক্লাবই সেই অর্থ পরিশোধ করে।

সব আলোচনা শেষ হওয়ার পর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, মেডিকেল পরীক্ষা। নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়ার আগে খেলোয়াড়ের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। বিশেষ করে বড় অঙ্কের দলবদলে এই পরীক্ষার গুরুত্ব অনেক। কোনো গুরুতর চোট বা শারীরিক সমস্যা ধরা পড়লে চুক্তির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক দলবদলের ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক রাখতে ফিফার অনলাইন ট্রান্সফার ম্যাচিং সিস্টেম বা টিএমএস ব্যবহৃত হয়। দুই ক্লাবের দলবদল সংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আর বিদেশি খেলোয়াড় কোনো দেশে খেলতে গেলে সেই দেশের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজন হতে পারে ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমতির।

সবশেষে তাই একটি দলবদলকে শুধু ‘এক ক্লাব থেকে অন্য ক্লাবে খেলোয়াড় যাওয়া’ বললে পুরো গল্পটা বলা হয় না। এর পেছনে থাকে স্কাউটিং, দুই ক্লাবের আলোচনা, এজেন্টের দর-কষাকষি, ব্যক্তিগত চুক্তি, বেতন, বোনাস, ট্রান্সফার ফি, বিভিন্ন শর্ত, মেডিকেল পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন। মাঠে একজন খেলোয়াড়ের পায়ে বল পৌঁছাতে যেমন অনেকের অবদান থাকে, তেমনি তাঁকে নতুন ক্লাবের জার্সিতে মাঠে নামাতেও কাজ করে বিশাল এক অদৃশ্য দল।


সময়ের আলো/টিকে


  বিষয়:   ফুটবলে দলবদল কীভাবে হয়  কোটি কোটি টাকা যায় কোথায় 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: