যে শব্দে হিম হয়ে যেত শিরদাঁড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে

2026-08-30T01:06:25+00:00
2026-08-30T01:06:25+00:00
 
  রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬,
১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস
যে শব্দে হিম হয়ে যেত শিরদাঁড়া
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১:০৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বাংলাদেশে ‘গুম’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যময়। বিগত প্রায় ১৬ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে শব্দটি দেশবাসীর মনে আতঙ্কের শিহরণ জাগিয়েছিল। শব্দটি শোনা মাত্রই শিরদাঁড়া হিম হয়ে যেত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একে একে উন্মোচিত হতে থাকে গুমের বিভিন্ন লোমহর্ষক কাহিনি।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ হচ্ছে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম-সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে। যাচাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে এমন মামলা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়। 

কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাদের ধারণা, ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কমিশনের কাছে আসেনি।

কমিশন জোরপূর্বক গুমকে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে কমিশন ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেছিল, জোরপূর্বক গুমের সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার প্রাথমিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ এবং গুমের ঘটনা গোপন রাখার জন্য একটি ‘সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা’র কথা বলা হয়।

পরবর্তী সময়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল, সারা দেশে এ ধরনের শত শত গোপন আটককেন্দ্র ছিল। অনেক ভুক্তভোগী মাস বা বছর ধরে বন্দি থাকার পর ফিরে এসেছেন, আবার অনেকে এখনও নিখোঁজ।

চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জীবিত ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের ৭৫ শতাংশ ছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে কমিশন জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগের মেয়াদজুড়েই গুমের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ছিল। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার স্বজনদের বিষয়ে তথ্যের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’ সত্য ও জবাবদিহির দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জোরপূর্বক গুম থেকে সবার সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদন করে। এতে গোপন আটককেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও ব্যবহারকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।


এদিকে ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের শাস্তি এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারকে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও ক্ষতিপূরণ তহবিল পাওয়ার জন্য ‘গুম সনদ’ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গত ৪ আগস্ট জনমত গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়াটি বর্তমানে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্প জানিয়েছে, তারা ওই সময়ের নথি সংরক্ষণ করবে। এর মধ্যে জোরপূর্বক গুম, হত্যাকাণ্ড এবং কথিত আয়নাঘর আটকব্যবস্থার বিষয়ও থাকবে। গুম ও হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে বলে কথিত অডিও রেকর্ডিংও সংগ্রহ করেছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) এক মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ২০০৯ সাল থেকে ৭০৮টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের দুই শতাধিক গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গুমের অবসানে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, আসক : গুমের অবসান ঘটাতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয় বলে মনে করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে গতকাল পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বলেছে, গুমের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

গুমের শিকার সব ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসক গুমের অবসান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান সম্পর্কে সত্য উদঘাটন এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   হিম  শিরদাঁড়া  আন্তর্জাতিক  গুম  প্রতিরোধ  দিবস  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: