দেশে প্যাডেল রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় প্রাইভেটকারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবিতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন এ লিগ্যাল নোটিস পাঠান।
নোটিসে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।
নোটিসে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ প্রাইভেটকার ব্যবহার করেন। অথচ এই স্বল্পসংখ্যক মানুষের ব্যবহৃত গাড়ি সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে রাখছে। এসব গাড়িতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি জ্বালানি ভর্তুকির ওপর অযৌক্তিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, প্রাইভেটকার থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সূক্ষ্ম বস্তুকণার মতো বিষাক্ত পদার্থ বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য ও সাধারণ মানুষের ‘জীবনের অধিকারের’ জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতে গণপরিবহন ও রিকশার ওপর নির্ভরশীল বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট ও বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে প্রান্তিক মানুষের একটি অংশ বাধ্য হয়ে প্যাডেল রিকশা চালানোর মতো কঠোর শারীরিক শ্রমে যুক্ত হচ্ছেন।
নোটিসে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ, বৃষ্টি, যানজট ও প্রতিকূল পরিবেশে যাত্রীবোঝাই রিকশা টানার কারণে এসব শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। এতে পেশি ও অস্থিসন্ধির ক্ষয়, অকাল বার্ধক্য ও অপুষ্টির মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এতে আরও বলা হয়, শুধু জীবিকা নির্বাহের তাগিদে এ শ্রম বেছে নেওয়া অনেকের জন্য স্বেচ্ছাধীন পেশা নয়; বরং দারিদ্র্যের কারণে তারা এতে বাধ্য হন।
সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ থাকায় সরকারকে প্যাডেল রিকশা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। নোটিসে আরও বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা স্থানীয় পরিবহনের একটি আধুনিক ও প্রয়োজনীয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এ পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হলে জনজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ কারণে গতি নিয়ন্ত্রণ, ব্রেকিং ব্যবস্থা, ব্যাটারির মান, গাড়ির কাঠামোগত নিরাপত্তা ও বৈজ্ঞানিক চার্জিং ব্যবস্থাসহ সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিসে বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নয়; বরং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের যাতায়াত, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এর ব্যবহার যৌক্তিক। দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যাডভোকেট মো. মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিসে উল্লেখ করেন, সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় প্রাইভেটকারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চহারে পরিবেশ কর আরোপের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বেকারত্ব কমাতে রাইড শেয়ারিং, রেন্ট-এ-কার ও মিটারভিত্তিক গাড়ি সেবা উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
নোটিসে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্যাডেল রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে নোটিসদাতাকে অবহিত করতেও বলা হয়েছে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি