নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পর উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে নেপাল। তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলোকে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, জীবিত কেউ আটকে থাকলে তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র জানিয়েছেন, হাজারো মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো, নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করা এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটানো।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ বন্যায় দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্যদিকে, তিব্বতের অংশে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪০ জনের বেশি মানুষের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
জলবিদ্যুৎ টানেলেও আটকে থাকতে পারেন শত শত শ্রমিক
নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে শত শত শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দিন-রাত অভিযান চালানো হচ্ছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে ভারত, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শত শত বিদেশি নাগরিকসহ আরও হাজারো মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিব্বতেও চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান
চীনা উদ্ধারকারী দলগুলো তিব্বতের দিকে নিখোঁজ ৫০০ জনের বেশি মানুষকে খুঁজতে অভিযান চালাচ্ছে। তবে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরং বন্দর এলাকায় এখনও কোনো জীবিত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উদ্ধারকারীরা দিন-রাত কাজ করে গিরং সীমান্তের সড়কপথ পুনরায় চালু করেছে এবং বন্যার ধ্বংসাবশেষ সরিয়েছে। এতে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
৪০টির বেশি সেতু ধ্বংস
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। জাতিসংঘ জানিয়েছে, বন্যায় ৪০টির বেশি সেতু ধ্বংস হয়েছে।
দুর্গম এলাকার মানুষদের কাছে খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক গ্রাম এখনও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে রয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞরাও সহায়তা করছেন। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে দুর্গম অঞ্চলগুলোতে জীবিতদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ গৃহহীন
নুয়াকোট ও রাসুয়া জেলার ২৭টি স্থানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের বেশিরভাগই স্কুল ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
অতিরিক্ত ভিড়, দূষিত পানি এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কারণে বর্ষা মৌসুমে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, জীবিতদের জীবন রক্ষা, চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তার ওপর এখন নতুন করে জোর দেওয়া হচ্ছে।
‘বন্যার সতর্কতা সময়মতো দেওয়া হয়নি’
বুধবার পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, এই দুর্যোগ মুহূর্তের মধ্যে মানুষের কাছ থেকে মা-বাবা, ভাই-বোনসহ প্রিয়জনদের কেড়ে নিয়েছে।
তিনি জানান, গত ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বন্যার খবর পাওয়ার পর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
তবে কেন আরও আগে বন্যার সতর্কতা দেওয়া হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে শাহ বলেন, ঘটনাটি প্রচলিত পূর্বাভাসের মাধ্যমে আগেভাগে নির্ভুলভাবে অনুমান করার মতো ছিল না।
আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
একটি নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহ ধসে পড়ার কয়েক দিন আগেই ওই এলাকায় অস্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরও উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে হয়তো অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো। এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার এবং চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ে বরফ ও পারমাফ্রস্ট, অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটির স্তর, দ্রুত গলে যাচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, এই দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নেপালের জলবায়ুজনিত দুর্যোগের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
শাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা এবং এর প্রভাব মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
১৫টি এলাকায় তিন মাসের জন্য দুর্যোগ ঘোষণা
নেপাল সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি এলাকায় তিন মাসের জন্য দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে। এ সময় নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, উদ্ধার কার্যক্রম, বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে নেপাল সরকার ও জাতিসংঘ যৌথভাবে চার মাসের মানবিক সহায়তার জন্য জরুরি আবেদন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের এক সপ্তাহ পরও হাজারো মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও সমন্বিত করার ওপর জোর দিচ্ছে নেপাল ও জাতিসংঘ।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ